রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে টিকে আছেন প্রায় ২ হাজার বেসামরিক বাসিন্দা, যাদের অন্তত ৫০টি শিশু। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, শহরটিতে খাবারের মজুত প্রায় শেষ হয়ে গেছে। খাবার ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটে শহরটির বাসিন্দারা এখন বেঁচে থাকার জন্য আগাছা পর্যন্ত খেতে বাধ্য হচ্ছেন। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খেরসনের বিপরীতে দিনিপ্রো নদীর ওপারে অবস্থিত ওলেশকি। যুদ্ধের আগে প্রায় ২৪ হাজার মানুষের বসবাস ছিল শহরটিতে। সেখানে আটকে পড়া এক নারী এক বার্তায় জানিয়েছেন, খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা অনাহারে রয়েছেন। যুদ্ধের আগে তার ওজন ছিল ১১০ কেজি। এখন তা কমে ৬৭ কেজিতে নেমেছে।

তিনি লিখেছেন, প্রথমে ওজন কমায় ভালো লাগলেও এখন বুঝতে পারছেন, প্রয়োজনীয় প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার ছাড়া তিনি মারা যেতে পারেন।

গত কয়েক দিনে ইউক্রেনীয় বাহিনী বড় ড্রোন ব্যবহার করে ওলেশকি ও আশপাশের এলাকায় জরুরি খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী আকাশপথে পৌঁছে দিতে বড় একটি অভিযান চালিয়েছে। খেরসনের সামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রায় চার টন খাবার ১০০টি স্থানে ফেলা হয়েছে। তবে রুশ বাহিনী এর কতটা আটকে দিয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ওলেশকির পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। তিনি শহরটিতে ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ আশঙ্কা প্রকাশ করে দ্রুত বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তার অভিযোগ, রাশিয়াই নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার পথে ‘একমাত্র বাধা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তরের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও চলতি মাসে ওলেশকির ‘সংকটজনক পরিস্থিতি’র কথা স্বীকার করেছেন। তবে মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে ইউক্রেনীয় বাহিনী বাধা দিচ্ছে বলে পাল্টা অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মে মাস পর্যন্ত কিছু খাদ্যসামগ্রী শহরে পৌঁছাত। কিন্তু এরপর রুশ বাহিনী মাইনফিল্ড ও ড্রোন নজরদারি বাড়ানোর পর সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলার কারণে রুশ সেনাদের সামনাসামনি অবস্থানরত ইউনিটগুলোর মধ্যেও খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা কোনোভাবে যে সামান্য খাবার জমিয়ে রেখেছিলেন, রুশ সেনারা সেগুলোও নিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাসিন্দাদের পাঠানো বার্তা থেকে জানা যায়, অনেক পরিবার এখন দিনে মাত্র একবার খাবার খেতে পারছে। আলু ছাড়াই জুচিনি দিয়ে তৈরি স্যুপের সঙ্গে কখনো কখনো তারা খাচ্ছেন টব বা বাগান থেকে সংগ্রহ করা আগাছা পার্সলেন।

ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, ড্রোনের মাধ্যমে খাবার পাঠানোর আগের চেষ্টাগুলোও খুব বেশি কাজে আসেনি। তাদের অভিযোগ, রুশ সেনারা ফেলে দেয়া খাবার নিয়ে গেছে এবং অন্তত একটি ঘটনায় খাবার পাওয়ার কথা ছিল এমন একজনকে আটক করা হয়েছে।

ওলেশকির সামরিক প্রশাসনের প্রধান তেতিয়ানা হাসানেঙ্কোর ভাষ্য, গত বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি শুরু হয়। রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকদের জন্য শহরে প্রবেশ ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। মাইনফিল্ডের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় এবং যানবাহন ড্রোন হামলার শিকার হওয়ায় ডিসেম্বরের পর খাদ্য সরবরাহ অনেক কমে যায়। বিদ্যুৎ ও এটিএম না থাকায় শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে গেছে।

হাসানেঙ্কো জানান, যুদ্ধের আগে ওলেশকির বাসিন্দারা নিজেদের জমিতে খাবার উৎপাদন করতেন। অতিরিক্ত ফসল ক্রিমিয়া ও খেরসন শহরেও বিক্রি করতেন তারা। এখন নিজেদের খাওয়ার মতো খাবারও উৎপাদন করতে পারছেন না।

তিনি আরো জানান, অনেক বাসিন্দা এখন শীতের জন্য মজুত করা ক্যানজাত সবজি, আচার ও মাংস খুঁজতে মাটির নিচের ঘর খুঁড়ছেন।

হাসানেঙ্কো বলেন, প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো শহর ওলেশকিতে মানুষ এত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আগে কখনো বসবাস করেনি। তার দাবি, হাসপাতালের বেসমেন্টসহ শহরের বিভিন্ন জায়গায় মরদেহ পড়ে আছে। অব্যাহত ড্রোন ওড়ার কারণে সেগুলো সরানো সম্ভব হচ্ছে না।