১৮৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে ভেনিজুয়েলার অরিনোকো নদী দিয়ে যখন দেশটির অভ্যন্তরে মার্কিন গানবোট ‘ইউএসএস উইলমিংটন’ প্রবেশ করছিল, তখন উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—নিজেদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ (বিশেষ করে স্বর্ণ খনি) নিশ্চিত করা। ১২৭ বছর পর, ২০২৬ সালে এসে যেন আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে বন্দি করার ঘটনা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা একে দেখছেন আমেরিকার পুরনো গানবোট বা শক্তির রাজনীতির প্রত্যাবর্তন হিসেবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি এখন ইতিহাসবিদদের ১৯ শতকের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। গানবোট ডিপ্লোম্যাসি মূলত এমন এক নীতি, যেখানে আলোচনা নয় বরং সামরিক শক্তির হুমকি প্রদর্শন করে অন্য দেশকে নতিস্বীকারে বাধ্য করা হয়। ভেনিজুয়েলায় সফল অভিযানের পর ট্রাম্প এখন গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তার ইঙ্গিত পরিষ্কার, যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কেবল একটি বৈশ্বিক শক্তি নয়, বরং একটি ‘সাম্রাজ্য’ হিসেবে আচরণ করবে।
এর আগে বিংশ শতাব্দীতেও আমেরিকা চীন ও লাতিন আমেরিকায় নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় নৌবাহিনীর ফ্লোটিলা ব্যবহার করত। স্টিভ ম্যাককুইন অভিনীত বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দ্য স্যান্ড পেবলস’-এ সেই সময়ের চিত্র ফুটে উঠেছিল। বর্তমানে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড যেন সেই সিনেমার বাস্তব রূপায়ন।
ভেনিজুয়েলার তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা ট্রাম্পের নীতিকে আমেরিকার ‘ব্যানানা ওয়ার্স’-এর কাতারে নিয়ে গেছে। গত শতাব্দীতে মার্কিন মেরিন সেনারা কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় বছরের পর বছর হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও হাইতিতে অবস্থান করেছিল। মেরিন জেনারেল স্মেডলি বাটলার পরবর্তীকালে আত্মস্বীকৃতিতে জানিয়েছিলেন, তিনি ‘পুঁজিবাদের একজন গ্যাংস্টার’ ছিলেন। যিনি স্ট্যান্ডার্ড অয়েল বা আমেরিকান সুগার কোম্পানিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে বেরিয়েছেন।
মজার বিষয় হলো, ট্রাম্পের নীতিতে অতীতের সেই ‘গণতন্ত্র রক্ষা’ বা ‘মানবাধিকারের’ মতো বড় বড় বুলির কোনো স্থান নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি বলেছেন, আমরা তেল ব্যবহার করতে যাচ্ছি এবং আমরা তেল নিতে যাচ্ছি।
২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় যারা ‘তেলের জন্য রক্ত নয়’ স্লোগান দিয়েছিলেন, তারা হয়তো অবাক হবেন যে একজন বর্তমান প্রেসিডেন্ট এখন সরাসরি তেলের জন্যই অভিযানের কথা স্বীকার করছেন।
ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের কাছে ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলো ‘ফরএভার ওয়ার’ হিসেবে পরিচিত। মার্জোরি টেইলর গ্রিন এর মতো রিপাবলিকান নেত্রীরাও ভেনিজুয়েলার এ ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের সমালোচনা করে একে আমেরিকান করদাতাদের অর্থের অপচয় বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে ভেনিজুয়েলার এ অভিযান গত দুই দশকের যুদ্ধের চেয়ে গুণগতভাবে আলাদা। এখানে আমেরিকা দীর্ঘস্থায়ী কোনো ‘স্টেট-বিল্ডিং’ বা রাষ্ট্র গঠনের দায়িত্ব নেয়নি। মাদুরোকে ধরার পর মার্কিন সেনারা দ্রুত প্রস্থান করেছে। কিন্তু এই ‘ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে যাওয়া’র নীতি ন্যাটো মিত্রদের জন্য স্বস্তির নয়। কারণ ট্রাম্প হয়তো রাষ্ট্র গঠনে আগ্রহী নন, কিন্তু তিনি নতুন ভূখণ্ড (যেমন গ্রিনল্যান্ড) দখলে অত্যন্ত আগ্রহী।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি এখন আর কেবল আদর্শিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা যেন ফিরে যাচ্ছে সেই যুগে, যেখানে বিশ্ব বিভক্ত ছিল পরাশক্তি ও তাদের অনুগত ‘ভ্যাসাল স্টেট’ বা করদ রাজ্যে। গ্রিনল্যান্ড থেকে ইরান—ট্রাম্পের হুমকি এখন সবদিকেই বিস্তৃত। আদর্শবাদকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে এখন কেবল ‘ব্যবসা ও ভূখণ্ড’ই হয়ে উঠেছে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির মূল চালিকাশক্তি। সিএনএন অবলম্বনে










