পল টমাস এন্ডারসনের হালের আলোচিত সিনেমা ‘ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার’। সমালোচকদের প্রশংসাসহ অস্কারসহ একাধিক পুরস্কারের আসরে সিনেমাটি পেয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। সেই চলচ্চিত্রের নাম ধার করে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রণ কৌশলের বিশ্লেষণ করেছেন সাংবাদিক নারি জিলবার। এফটিতে ছাপা হওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্বসুরিদের তুলনায় অনিশ্চিত এক যাত্রাকে সঙ্গী করেছেন নেতানিয়াহু।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। এদিন ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর ‘পূর্ণ বিজয়ের’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় পরও ‘ইসরায়েলের শত্রুরা’ দুর্বল হলেও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। গাজা পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও অঞ্চলটির অর্ধেক এখনো হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন। ২০২৪ সালে লেবাননে হিজবুল্লাহকে ‘চূর্ণ’ করার দাবি করেন নেতানিয়াহু তার। কিন্তু সশস্ত্র গোষ্ঠীটি উত্তর ইসরায়েলে নিয়মিত রকেট হামলা চালাচ্ছে। আর ইরানের বিরুদ্ধে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ ঘোষণার এক বছরেরও কম সময় পর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ফের তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে।

নানা ফ্রন্টে যু্দ্ধে জড়িয়ে যাওয়া নেতানিয়াহু এখন আর নির্দিষ্ট করে ‘চূড়ান্ত জয়ের’ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন না। বরং হুমকি কখনো পুরোপুরি শেষ হবে না, সময় অনুযায়ী যুদ্ধের তীব্রতা কমবে-বাড়বে এবং আঞ্চলিক ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ নিয়ে এমন কথা বলছেন তিনি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট—ইসরায়েলকে এমন এক ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, যেখানে বিপদ স্থায়ী এবং সংঘাত হবে অনির্দিষ্টকালের।

এ নীতির মূল দিক—সম্ভাব্য হুমকি মনে হলে কোনো পক্ষকে আগেই আঘাত, প্রতিবেশী এলাকা দখল করে ‘বাফার জোন’ তৈরি, এবং নিরাপত্তার একমাত্র নিশ্চয়তা হিসেবে নিয়মিত সামরিক শক্তি প্রয়োগ। সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলশটেইনের মতে, এটি এক ধরনের পোস্ট-ট্রমাটিক জাতীয় নিরাপত্তা নীতি। ৭ অক্টোবরের আঘাতের পর দ্রুত গড়ে ওঠা এ ধারণায় গভীর বিশ্লেষণের ঘাটতি রয়েছে
lebanon_reuters

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে লেবাননের বিস্তৃত অঞ্চল। ছবি: রয়টার্স

সাম্প্রতিক এক সামরিক অনুষ্ঠানে রূপকের মাধ্যমে ইসরায়েলের নীতি তুলে ধরেন নেতানিয়াহু। সহজে করে বললে, হুমকি সহ্য করে আর বসে থাকবে না তেল আবিব। ‘জঙ্গলের শত্রুর ভয়ে দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে থাকার দিনও শেষ। আপনি যদি জঙ্গলে না যান, জঙ্গলই আপনার কাছে আসবে।’ এ দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেক বিশ্লেষক ‘নেতানিয়াহু ডকট্রিন’ হিসেবে দেখছেন।

এ নীতির মূল দিক—সম্ভাব্য হুমকি মনে হলে কোনো পক্ষকে আগেই আঘাত, প্রতিবেশী এলাকা দখল করে ‘বাফার জোন’ তৈরি, এবং নিরাপত্তার একমাত্র নিশ্চয়তা হিসেবে নিয়মিত সামরিক শক্তি প্রয়োগ। সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাইকেল মিলশটেইনের মতে, এটি এক ধরনের পোস্ট-ট্রমাটিক জাতীয় নিরাপত্তা নীতি। ৭ অক্টোবরের আঘাতের পর দ্রুত গড়ে ওঠা এ ধারণায় গভীর বিশ্লেষণের ঘাটতি রয়েছে।

সমালোচকেরা বলছেন, নেতানিয়াহুর নতুন এ কৌশলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করার মতো কোনো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেই। বরং একের পর এক যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানবিক ক্ষয়ক্ষতির দিকটিও উপেক্ষিত হচ্ছে। মিলশটেইনের ভাষায়, এ দৃষ্টিভঙ্গি এমন—‘আমরা আরবদের বিশ্বাস করি না; আমরা শুধু শক্তি ও ভূখণ্ডে বিশ্বাস করি।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ধাক্কা দিয়েছে। যদিও সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে আগে আঘাত করার নীতি নতুন নয়। ১৯৮১ সালে মেনাখেম বেগিন ইরাকের পারমাণবিক চুল্লিতে হামলা চালান, যা ‘বেগিন ডকট্রিন’ নামে পরিচিত হয়। ২০০৭ সালে এহুদ ওলমার্ট সিরিয়ার একটি পারমাণবিক স্থাপনায় একই ধরনের হামলা চালান।

দীর্ঘদিন ধরে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে পরিচিত নেতানিয়াহুকে তুলনামূলক সতর্ক মনে করা হতো। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, নেতানিয়াহু বরাবরই ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার পর সেই সতর্কতা যেন হারিয়ে গেছে। তার ভাষায়, ‘এখন সেই সতর্কতা আর নেই।’

সাবেক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, এখন ইসরায়েলের মূল নীতি হলো—শান্তি কিনে আনা যায় না; বরং হুমকি ঠেকাতে আগেই যুদ্ধ শুরু করতে হয়। তার মতে, ‘৭ অক্টোবরের পর অন্য কোনো বিকল্প নেই।’

নেতানিয়াহু সরকার দক্ষিণ লেবানন, গাজা ও সিরিয়ায় স্থায়ী ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা দিয়ে এটি টেকসই নয়। এ চাপের কারণে সেনাপ্রধান এয়াল জামির সতর্ক করে বলেছেন, আরো প্রায় ১৫ হাজার সেনা প্রয়োজন, যার অর্ধেকই স্থলযুদ্ধে লড়বে। তার সতর্কবার্তা, এ হারে যুদ্ধ চললে সেনাবাহিনী নিজেই ভেঙে পড়বে
Aid trucks begin entering Gaza under agreement with Egypt to bypass Rafah

ইসরায়েলি আক্রমণের প্রভাব পড়েছে গাজার প্রতিটি অঞ্চলে। ছবি: রয়টার্স

তবে নেতানিয়াহুর পূর্বসূরিদের যুদ্ধের তুলনায় বর্তমান সংঘাতগুলোর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড বেন গুরিয়ন ছোট ও দ্রুত শেষ হওয়া যুদ্ধের নীতি অনুসরণ করতেন। কিন্তু বর্তমানে ইসরায়েল আড়াই বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে—যা তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী এখন ইরানের সঙ্গে আকাশযুদ্ধ চালাচ্ছে, লেবাননে স্থল অভিযান বাড়াচ্ছে, গাজার অর্ধেক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সিরিয়ার বড় অংশ দখলে রেখেছে। পাশাপাশি পশ্চিম তীরেও সেনা বাড়ানো হয়েছে এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও আবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে।

নেতানিয়াহু সরকার দক্ষিণ লেবানন, গাজা ও সিরিয়ায় স্থায়ী ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা দিয়ে এটি টেকসই নয়। এ চাপের কারণে সেনাপ্রধান এয়াল জামির সতর্ক করে বলেছেন, আরো প্রায় ১৫ হাজার সেনা প্রয়োজন, যার অর্ধেকই স্থলযুদ্ধে লড়বে। তার সতর্কবার্তা, ‘এ হারে যুদ্ধ চললে সেনাবাহিনী নিজেই ভেঙে পড়বে।’

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ এক মাসের বেশি সময় পার করেছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ইহুদি ইসরায়েলিদের ৭৮ শতাংশ এ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। তবে সরকার বিরোধীরা মনে করেন, নির্বাচন সামনে রেখে স্থায়ী যুদ্ধাবস্থায় রাখা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থও রক্ষা করছে। সমালোচনা করলে তা ‘দেশপ্রেমবিরোধী’ বলে দমন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সমালোচকেরা বলছেন, নেতানিয়াহুর নতুন এ কৌশলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করার মতো কোনো কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেই। বরং একের পর এক যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মানবিক ক্ষয়ক্ষতির দিকটিও উপেক্ষিত হচ্ছে। মিলশটেইনের ভাষায়, এ দৃষ্টিভঙ্গি এমন—আমরা আরবদের বিশ্বাস করি না; আমরা শুধু শক্তি ও ভূখণ্ডে বিশ্বাস করি।
Iran says attack on Israel is over as fears grow of wider conflict_thumb

ইরানের পাল্টা হামলা ইসরায়েলে তৈরি করেছে ব্যাপক সংকট। ছবি: রয়টার্স

তবু বাস্তবতার সঙ্গে সরকারের প্রতিশ্রুতির ফারাক নিয়ে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে উত্তর ইসরায়েলের বাসিন্দারা হিজবুল্লাহর রকেট হামলা বন্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপ চান। এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘পূর্ণ বিজয় ছিল শুধু একটি স্লোগান।’

অন্যদিকে নেতানিয়াহু ও তার সমর্থকরা বলছেন, সামরিক কৌশল সঠিক পথে এগোচ্ছে এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছে। সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইয়াকোভ আমিদরের মতে, গাজা, লেবানন ও ইরানে ধারাবাহিক অভিযান চালানোর উদ্দেশ্য ছিল একসঙ্গে বহু ফ্রন্টে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানো। তার ভাষায়, ‘প্রতিটি ফ্রন্টে বড় আঘাত করা হয়েছে, কিন্তু কাজ এখনো শেষ হয়নি।’

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান যুদ্ধ শেষ হলে লেবাননে অভিযান আরো জোরদার হবে এবং প্রয়োজনে আবার গাজায় মনোযোগ দেয়া হবে। কখনো কখনো এমনও বলা হচ্ছে, ইরানের ক্ষেত্রে লক্ষ্য সরকার উৎখাত নয়, বরং তাদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং হুমকি দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দেয়া।

তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, সামরিক সাফল্যকে কৌশলগত বা কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে না পারাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ব্যর্থতা। একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘যেখানে সমস্যা, সেখানে সেনাবাহিনী পাঠানো হচ্ছে—কিন্তু সেটাই শেষ লক্ষ্য নয়।’

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনমত বিভক্ত। তবুও নেতানিয়াহু মনে করেন, দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে গেলে ইরান হয় দুর্বল হয়ে পড়বে, নয়তো আলোচনায় বসতে বাধ্য হবে। তার ধারণা, শেষ পর্যন্ত তারা ‘আত্মসমর্পণ করবে বা সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়বে।’

সব মিলিয়ে, নতুন এ নিরাপত্তা নীতি ইসরায়েলকে এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে স্থায়ী শান্তির চেয়ে ধারাবাহিক সংঘাতই বাস্তবতা হয়ে উঠছে।