ইসরায়েলে হামলার পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ইরান রোববার (১৪ এপ্রিল) বলেছে যে তারা এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই শুরু করতে চায় না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান এবং তার জনগণের ওপর সামরিক হামলা শুরু করে, তাহলে ইরান ন্যায্যভাবে আত্মরক্ষা করবে।
জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধি আমির সাইদ ইরাভানি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বলেছেন, শনিবার (১২ এপ্রিল) ইসরায়েলে ইরানের হামলা সঠিক ছিল। কারণ এটি বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি না করতে সাবধানতার সঙ্গে করা হয়েছে।
শনিবার (১৩ এপ্রিল) মধ্যরাত থেকে শুরু করে রোববার (১৪ এপ্রিল) ভোর পর্যন্ত ইরান তার শত্রুদেশ ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে তিনশ এর বেশি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং শক্তিশালী ড্রোন ব্যবহার করা হয়। তবে এসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বেশিরভাগই ইসরায়েল মাটিতে নামিয়ে আনতে পেরেছিল বলে জানিয়েছে। ইসরায়েল ছাড়াও এ কাজে অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান ও ব্রিটেন। হামলায় দুই জেনারেলসহ সাতজন বিপ্লবী গার্ড নিহত হন। তবে ইরানের দাবি, ইরান পূর্বে সতর্ক করেছিল যে তারা ১ এপ্রিল ইরানে হওয়া ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেবে।
ইসরায়েলের স্থায়ী প্রতিনিধি গিলাদ এরদানের আহ্বানে নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক সংঘটিত হয়। বৈঠকে এরদান দ্ব্যর্থহীনভাবে ইরানের নিন্দা (এবং) অবিলম্বে আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে মনোনীত করার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, শনিবারের হামলাটি জাতিসংঘের সনদের ৫১ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। অনুচ্ছেদটিতে বলা আছে, জাতিসংঘের সদস্যদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ ঘটলে যতক্ষণ না নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটি ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত আত্মরক্ষার অন্তর্নিহিত অধিকারকে আহ্বান করে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত রবার্ট উড বৈঠকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ইরান বা তার প্রক্সিরা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরো পদক্ষেপ নেয় তবে এর পরবর্তী দায়ভার ইরানকে নিতে হবে।
উড ইরান এবং তার জঙ্গি প্রক্সি এবং অংশীদারদের দ্বারা ইসরায়েলের ওপর নজিরবিহীন হামলার কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। তিনি বলেন, ইরানের বেপরোয়া পদক্ষেপ শুধুমাত্র ইসরায়েলের জনসংখ্যার জন্যই নয়, জর্ডান এবং ইরাকসহ এ অঞ্চলের জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন এই কূটনীতিক আরো বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র প্রদান করে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সম্প্রতি লোহিত সাগরে ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হুথি হামলায় সহযোগিতার মাধ্যমে ইরান স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের উচিত ইরানের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা চাওয়া।
উড ইসরায়েলে সংঘটিত হওয়া ৭ অক্টোবরের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগেও ইরানকে অভিযুক্ত করেন।
ইসরায়েলের গিলাদ এরদান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। খুব দেরি হওয়ার আগেই ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে বৈঠকে রাশিয়ার ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলের হামলার পরে অনুরূপভাবে সমাবেশ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নিরাপত্তা পরিষদকে ভণ্ডামি এবং দ্বৈত মানদণ্ডের জন্য অভিযুক্ত করেছে।
চীনের উপ স্থায়ী প্রতিনিধি দাই বিং ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানের হামলার বিবৃতিকে উল্লেখ করে বলেন, ইরানের সামরিক পদক্ষেপকে দেশটিতে ঘটা ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে বিষয়টি শেষ বলে মনে করা যেতে পারে।
তিনি আরো বলেন, যদি গাজা সংঘাতের শিখা ক্রমাগত চলতে দেয়া হয়, তাহলে প্রতিকূলতা আরো ছড়িয়ে পড়বে এবং এটি এ অঞ্চলকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে।
বৈঠকে আলজেরিয়া আবারো গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ইসরায়েলের জঘন্য হত্যাযজ্ঞ অবসানের আহ্বান জানিয়েছে।
স্লোভেনিয়ার স্যামুয়েল জবোগার বলেন, এ হামলাগুলোর সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি হামলার সম্পর্ক অস্বীকার করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি হামলার ঘটনাগুলো সহিংসতার ক্ষেত্রকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
জবোগার সব পক্ষকে সংলাপ ও কূটনীতির পথ বেছে নেয়া এবং প্রতিনিয়ত প্রতিশোধ নেয়া থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করেন।
মাল্টার জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত ভেনেসা ফ্রেজিয়ার বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং সবচেয়ে অস্থির সময়ের সম্মুখীন হচ্ছে, যেখান থেকে সব পক্ষ এক ধাপ পিছিয়ে না এলে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সিয়েরা লিওনের জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত মাইকেল ইমরান কানু সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা বিপজ্জনক এবং নজিরবিহীন। এটি যে শুধুমাত্র মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলগুলোকে অস্থিতিশীল করছে তা নয়, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে।










