‘আমি প্রত্যাশা করছি, যত দ্রুত সম্ভব এ যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরব। আমাকে হয়তো আর কখনো সাইরেন শুনতে হবে না’—বলছিলেন ভিতা নামে এক ইউক্রেনীয় কিশোরী। যদিও ভিতার প্রত্যাশা থেকে বাস্তবতার ব্যবধান অনেক দূরে। দুই পেরিয়ে তিন বছরে প্রবেশ করেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যেখানে মাত্র কয়েক দিন আগেই রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ শহর আভদিভকার দখল হারিয়েছে ইউক্রেন। অন্যদিকে অস্তিত্ব রক্ষায় এখনো দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কিয়েভ।
যুদ্ধ কবে শেষ হবে—এর উত্তর নেই কারো কাছে। সম্প্রতি মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে এ প্রশ্ন করা হয়েছিল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে। তার পাল্টা প্রশ্ন, ‘পুতিনের বদলে এ প্রশ্ন আমাকে করছেন কেন? পুতিনকেই জিজ্ঞেস করুন কেন তিনি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন।’
এ যুদ্ধের চরম মাশুল গুনতে হয়েছে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষকে। ছেলের ঘরে ফেরার প্রহর গুনছেন বাবা-মা। সধবারা বিধবা হয়েছেন। শ্রেণীকক্ষগুলো ফাঁকা। বন্ধুরা চলে গেছে অন্যত্র বা মারা গেছে। অপরিচিতরা এমনকি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরের গ্রামগুলোর চিত্রও একই রকম। সব মিলিয়ে দেশটির সাধারণ নাগরিকের সবকিছু ওলটপালট। এর পরও হতাশ নন তারা।
অ্যানথহিলের বাসিন্দা ভ্যালেরি বলছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি ঠিক জানি না কবে যুদ্ধ শেষ হবে। তবে আমি জানি, আমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের লড়াই চালিয়ে যাওয়া উচিত।’
দুই বছর ধরে চলা ভয়াবহ এ সংঘাতে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দুই দেশেরই। বিভিন্ন জরিপ বলছে, ইউক্রেনে বেসামরিক ব্যক্তি মারা গেছে ১০ হাজারেরও বেশি। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, ইউক্রেনের তিনজনের মধ্যে একজন বাস্তুচ্যুত। দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত ৫০ লাখ আর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হয়েছে ৬০ লাখের বেশি। দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে ইউক্রেনের এক-চতুর্থাংশ মানুষ। ধ্বংস হয়ে গেছে দেশটির কৃষি ব্যবস্থা। বেশির ভাগ জমিতেই পোঁতা রয়েছে রাশিয়ার স্থল মাইন। ফলে মরণ ফাঁদ হয়ে উঠেছে কৃষিজমি।
সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গোটা বিশ্বেই। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানি তেল ও খাদ্য রফতানি, যার প্রভাব পড়েছে সব ক্ষেত্রে। একদিকে বেড়েছে খাদ্যপণ্যের দাম, অন্যদিকে দেখা দিয়েছে খাবারের সংকট। সংঘাত বন্ধে কয়েকবার আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। উল্টো হামলা জোরদার করেছে রাশিয়া। পশ্চিমা অস্ত্রে পাল্টা জবাব দিয়েছে ইউক্রেনও।
সম্প্রতি কিয়েভকে সামরিক সহায়তা দেয়া নিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে দোটানা আরো আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে পুতিনকে। সম্প্রতি ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহর ‘আভদিভকা’র দখলে নিয়ে তার জানান দিয়েছে পুতিন বাহিনী। শিগগিরই যুদ্ধ থামার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং যুদ্ধের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি তা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনজুড়েই এখন এ ধরনের সমাধিক্ষেত্র চোখে পড়ে, যা যুদ্ধের ভয়াবহ চিহ্ন বহন করে চলছে। ভয়ংকর এ যুদ্ধ এখন তৃতীয় বছরে প্রবেশ করছে, যার আসলে কোনো শেষ আছে কি?
এত কিছুর মধ্যেও এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন দেখছে ইউক্রেনীয়রা। ক্রিভি রিহ অঞ্চলের বাসিন্দা ইউরি বলছিলেন, ‘শেষ যখন আমি আমার সন্তানকে খোলা মাঠে খেলতে দেখেছিলাম, সেটা ছিল রাশিয়ার আগ্রাসনের আগে। তারা এখন ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তৈরি হওয়া ধ্বংস্তস্তূপের পাশে ঘোরাফেরা করে, এদিক-সেদিক তাকায়। আমি এখনো এমন একটি দিনের স্বপ্ন দেখি যখন কোনো সাইরেন বাজবে না। আমার সন্তান বন্ধুদের সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে খেলতে পারবে।’ খবর বিবিসি ও রয়টার্স।










