যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করেছে। এ ঘটনায় একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও উৎসবের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বনেতারা ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। বিশ্বব্যাপী এ ঘটনা গভীর বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খবর নিউইয়র্ক পোস্ট, রয়টার্স ও আনাদোলু এজেন্সি।
যুক্তরাষ্ট্রে এ ঘটনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। শিকাগোয় কয়েকশ মানুষ ফেডারেল প্লাজার সামনে সমবেত হয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। বিক্ষোভকারীরা অভিযানের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এটিকে ‘সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
একই সময় নিউইয়র্কসহ অন্যান্য শহরে ভেনিজুয়েলার অভিবাসীরা মাদুরোর পতন উদযাপন করেছে। মিডটাউন ম্যানহাটনে প্রায় ১০০ জন মানুষ পতাকা উড়িয়ে নাচছিলেন। চার বছর আগে ভেনিজুয়েলা ত্যাগ করা বেইট্রিজ হার্নান্দেজ জানান, মাদুরোকে বন্দি করার খবর তার পরিবারকে ফিরিয়ে আনার ও নিরাপদে দেশে ফিরে যাওয়ার আশা জোগাচ্ছে।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। চীন, রাশিয়া, ইরান, ব্রাজিল, কিউবা ও মেক্সিকো কঠিন ভাষায় এ অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে এবং এটিকে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। চীন এটিকে ‘নিজের স্বার্থে অন্য দেশের ওপর দাপুটে পদক্ষেপ’ বলে আখ্যায়িত করেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। রাশিয়া মাদুরোর সরকারের পাশে থাকার সংকল্প ব্যক্ত করেছে। ইরান জানিয়েছে, এটি ‘জাতিসংঘের মূল নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন’।
ইউরোপের দেশগুলো মূলত সংযম ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ বলেছেন, ‘মার্কিন হস্তক্ষেপের আইনগত মূল্যায়ন জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এখন দেশটির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।’
স্পেন, ইতালি, ডেনমার্ক, স্লোভেনিয়াসহ অন্য দেশগুলো সতর্কতা ও নাগরিকদের সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) সমঝোতা, সহিংসতা এড়ানো এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্বে জোর দিয়েছে।
তবে কিছু দেশ যুক্তিরাষ্ট্রের এ অভিযানকে সমর্থন করেছে। ইসরায়েল এটিকে ‘নিজ দেশের পক্ষে ন্যায়বিচারের নেতৃত্ব’ হিসেবে দেখেছে। ইউক্রেন ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের স্বাধীন জীবনযাপনের অধিকার সমর্থন করেছে। আঞ্চলিক শক্তি তুরস্ক স্থিতিশীলতা ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।
জাতিসংঘ ও আফ্রিকান ইউনিয়নের (এইউ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ অভিযানকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ উদাহরণ’ হিসেবে উল্লেখ করে ভেনিজুয়েলার মানুষের সুরক্ষা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এইউ সব পক্ষকে সংযম, দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন মানার আহ্বান জানিয়েছে এবং রাজনৈতিক সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
মার্কিন সামরিক অভিযান ও মাদুরোকে বন্দি করার পর বিশ্বজুড়ে বিভাজন আরো গভীর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং কিছু সম্প্রদায় ও দেশের আশা—সবই দেশটির রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক শান্তি ও মার্কিন বৈশ্বিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।










