ইসরায়েলি এক কমব্যাট সেনা সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তার সহযোদ্ধাদের উল্লাস ও পরস্পরকে অভিনন্দন জানানোর একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, গাজা উপত্যকার ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অংশের কাছে একটি ফিলিস্তিনি গাড়িতে আঘাত হেনেছিল ওই সেনারা। এতে গাড়িতে থাকা সবাই নিহত হয়। সেই ঘটনা নিয়েই তাদের উল্লাস।
কয়েক সপ্তাহ গাজায় মোতায়েন থাকা রিজার্ভ সৈন্যটি বলেন, ১০ অক্টোবর ‘ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই এমন দৃশ্য সাধারণ হয়ে উঠেছিল। ফিলিস্তিনিরা যখনই তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ অতিক্রম করেছে বা কাছাকাছি গেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগকে সৈন্যরা প্রায় উপভোগই করেছে।
২০-এর কোঠায় থাকা ওই সৈন্য বলেন, ‘ওটা একটা জঙ্গল ছিল। যুদ্ধবিরতির পর নির্দেশ ছিল, কেউ লাইন অতিক্রম করলে গুলি করো।’
ইসরায়েলি তৎপরতার কারণে কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধবিরতি এখন অনেকটাই স্থবির। তিন ইসরায়েলি সেবা বার্তা সংস্থা এপি-কে জানিয়েছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে দায়িত্ববিধি নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে।
তারা বলেন, কিছু কমান্ডার প্রকাশ্যে যুদ্ধবিরতির কথা বললেও ভেতরে ভেতরে গাজায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করতেন। এক সৈন্যের মতে, অনেক সময় সৈন্যরা খুব দূরে অবস্থান করায় বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কারা লক্ষ্যবস্তু তা বুঝতেই পারতেন না। এ ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সাবেক সেনাদের একটি হুইসলব্লোয়ার গোষ্ঠীও।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজার ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত অংশে কী ঘটছে তার বিরল এক ঝলক ওঠে আসে এ সৈন্যদের বিবরণে। তবে তারা সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন। কারণ পরিচয় প্রকাশ হলে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হতে পারে। সৈন্যরা বলেন, যা দেখেছেন তাতে তারা ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত। তাই মুখ খুলেছেন।
ইয়েলো লাইন: অস্পষ্ট সীমারেখা, ধীরে ধীরে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরায়েল সেনারা একটি বাফার জোনে ফিরে যায়, যা ‘ইয়েলো লাইন’ দিয়ে চিহ্নিত। এর মাধ্যমে গাজার অর্ধেকের বেশি অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ইসরায়েল। চুক্তি অনুযায়ী, ইসরায়েলি বাহিনীর আরো পিছু হটার কথা থাকলেও এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই।
ইয়েলো লাইনের অবস্থানও অনেক জায়গায় অস্পষ্ট। কোথাও এটি হলুদ ব্লক ও ব্যারেল দিয়ে চিহ্নিত, আবার কোথাও একেবারেই দৃশ্যমান নয়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সম্প্রতি এপি-কে গাজার মধ্যাঞ্চলের মাঘাজি শরণার্থী শিবিরের কাছে একটি অংশ দেখায়। সেখানে লাইনটি একটি প্রশস্ত মাটির রাস্তা ও ছোট হলুদ চিহ্ন দিয়ে চিহ্নিত ছিল। পূর্বদিকে ছিল একটি জনশূন্য এলাকা, আর প্রায় ৫০০ মিটার দূরে ছিল সুরক্ষিত একটি ইসরায়েলি সামরিক পোস্ট।
এক ইসরায়েলি সামরিক কমান্ডার বলেন, ওই লাইনের অপর পাশে সক্রিয় হামাস এবং প্রায়ই সশস্ত্র সদস্য ও বেসামরিক মানুষকে লাইন পরীক্ষা করতে পাঠায়।
তিনি বলেন, ‘কারো জন্যই এই লাইনের কাছে আসার প্রয়োজন নেই। এখানে কিছুই নেই।’
সেনাবাহিনীর দাবি, গাজার পুরো সীমারেখা এখন স্পষ্টভাবে চিহ্নিত।

ইসরায়েলের চাপিয়ে দেয়া ইয়োলা লাইনের চিহ্ন। ছবি: এপি
যুদ্ধবিরতির পর নয় শতাধিক মৃত্যু
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় নয় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এদের অনেকে ইয়েলো লাইনের কাছে বা অতিক্রম করার সময় মারা গেছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশু রয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, যারা লাইন অতিক্রম করেছে তাদের বেশির ভাগই সৈন্যদের জন্য হুমকি ছিল। তবে এপি ও সাবেক সেনাদের সংগঠন ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের কাছে সাক্ষ্য দেয়া সৈন্যরা বলেন, অনেক সময়ই দূরত্ব ও দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব হয়নি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, ইয়েলো লাইনের আশপাশের এলাকা ‘সংবেদনশীল অভিযান-সংক্রান্ত পরিবেশ’ এবং সেখানে সতর্কীকরণ চিহু রয়েছে। বেসামরিকদের শুধু লাইনের কাছে আসার কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয় না। নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে সতর্ক করা হয়, তবে তাৎক্ষণিক হুমকির ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
দ্রুত সিদ্ধান্ত, অনুমানের ভিত্তিতে নির্দেশ
দ্বিতীয় দফায় গাজায় যাওয়া এক কমব্যাট সৈন্য জানান, যুদ্ধবিরতি শুরু হলে তাকে ইয়েলো লাইনের কয়েকশ মিটার দূরে অবস্থান দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি বলেন, সেখানে লাইন অতিক্রম করার চেষ্টা করা একাধিক মানুষকে সৈন্যরা গুলি চালিয়ে হত্যা করে।
তার মতে, অনেক সময় সৈন্যরা সঠিকভাবে জানত না কে লাইন পার হচ্ছে। ড্রোন বা উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন নিতে হলেও দ্রুত সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সময় অনুমান বা শেষ দেখা অবস্থানের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেয়া হতো।
ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স জানায়, নিয়মগুলো অত্যন্ত শিথিল। বিশেষ করে যারা লাইন অতিক্রম করে তাদের ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় ‘শুট টু কিল’ নির্দেশ কার্যকর ছিল।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক নাদাভ ওয়েইমান এক সময় গাজার যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তবে চলমান সংঘাতে নয়। তিনি বলেন, কমান্ডারদের নীতি এমন বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে অসংখ্য বেসামরিক মানুষ সীমারেখা অতিক্রম করায় নিহত হচ্ছে।
এক সাক্ষ্যে বলা হয়, ইয়েলো লাইন অতিক্রম করা যেকোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে নির্দেশ ছিল, ‘যেকোনো মূল্যে তাকে নির্মূল করো।’
জীবনের কোনো মূল্য নেই
যুদ্ধবিরতির পর কয়েক সপ্তাহ গাজায় অবস্থান করা এক সেনা বলেন, কমান্ডারদের বার্তা ছিল যেকোনো মূল্যে লাইন ধরে রাখা। তিনি বলেন, ‘সেখানে এমন একটা অনুভূতি ছিল যে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই।’
তিনি আরো বলেন, ইয়েলো লাইন নির্ধারণে ঊর্ধ্বতনরা বলেছিলেন এটি নির্ধারণ করা ‘অতিরিক্ত কাজ’। তাদের দায়িত্ব নয় এবং ফিলিস্তিনিদেরই বুঝে নেয়া উচিত কোথায় সীমারেখা।
তিনি জানান, মানসিকভাবে এ অভিজ্ঞতা অত্যন্ত কঠিন ছিল। কখনো কখনো স্নাইপাররা সতর্কতামূলক গুলি চালাত। কিন্তু কমান্ডাররা আরো কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলতেন। সৈন্যরা একে আরো প্রাণঘাতী গুলির নির্দেশ হিসেবে বুঝতেন।
তিনি ও অন্য সৈন্যরা বলেন, মাঠ পর্যায়ে ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ইসরায়েল গাজায় দীর্ঘ সময়ের জন্য থাকবে, দ্রুত প্রত্যাহারের জন্য নয়।
ইসরায়েলের ‘প্রোঅ্যাকটিভ’ হামলা বৃদ্ধি
ত্রাণ সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রচারিত একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজাজুড়ে ইসরায়েল ‘ক্রমশ আরো প্রোঅ্যাকটিভ’ হামলা চালাচ্ছে। অর্থাৎ কোনো ধরনের হুমকি দেখা না গেলেও আক্রমণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্টের তথ্যানুযায়ী, গত এপ্রিল ছিল চলতি বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি বা অতিক্রম করা ব্যক্তিদের মৃত্যুর হার ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
গত সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েল গাজার ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং পরবর্তী লক্ষ্য ৭০ শতাংশে পৌঁছানো।
‘এটাকে যুদ্ধবিরতি বলা বন্ধ করা উচিত’
মাঠ পর্যায়ের সৈন্যদের মতে, বাস্তবে এই যুদ্ধবিরতি কার্যত অনুপস্থিত। এক সৈন্য শেষ মন্তব্যে বলেন, ‘আমাদের এই শব্দটা ব্যবহার বন্ধ করা উচিত, “যুদ্ধবিরতি”। যারা সত্যিই যুদ্ধ থামাতে চায়, তাদের জন্য এটি কোনো কাজে আসছে না।’










