ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আজ অনুষ্ঠিত হবে। তার শেষকৃত্য উপলক্ষে এরই মধ্যে রোমে হাজির হতে শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার পাশাপাশি ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইউক্রেন, আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা। রোমের ঐতিহাসিক সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে আজ সকাল ১০টায় (স্থানীয় সময়) শুরু হবে পোপ ফ্রান্সিসের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান। কার্ডিনাল জিওভান্নি বাতিস্তা রে-এর নেতৃত্বে এ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন শতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও রাজপরিবারের সদস্যরা। মোট ৫০ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেবে এ শেষকৃত্যে।
ঐতিহ্যগতভাবে পোপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা হয়ে থাকে। তবে পোপ ফ্রান্সিসের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে না। তার নির্দেশনা অনুযায়ী, ঐতিহ্যবাহী তিন স্তরের কফিনের বদলে ব্যবহার করা হবে একটি সাধারণ কাঠের কফিন। যার ভেতরে থাকবে জিঙ্ক লাইনিং। এছাড়া তার দেহ প্রদর্শনের জন্য উঁচু বেদি বা বালিশের ব্যবস্থা করা হবে না। অতীতে পোপদের শেষকৃত্যে তিন স্তরের কফিন ব্যবহার করা হতো—প্রথমে সাইপ্রাস কাঠের কফিন, তারপর লেডের কফিন এবং সবশেষে ওকের কফিনে দেহাবশেষ রাখা হতো। গত বছর সাধারণভাবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেছিলেন, ‘মরদেহ রাখা হোক একটিমাত্র কাঠের কফিনে, যার ভেতরে দস্তা (জিঙ্ক) দিয়ে আবরণ দেয়া থাকবে।’
বেশির ভাগ পোপ যেখানে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার নিচে অবস্থিত গুহাগুলোয় সমাহিত হন, সেখানে ফ্রান্সিস বেছে নিয়েছেন রোম শহরের এস্কুইলিনো অঞ্চলে অবস্থিত সান্তা মারিয়া ম্যাজিওরে ব্যাসিলিকাকে, যা ভ্যাটিকানের বাইরে অবস্থিত। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষে একটি মিছিলের মাধ্যমে তার কফিন স্থানান্তর করা হবে সান্তা মারিয়া ম্যাজিওরে। প্রাচীন রোমের সাতটি পাহাড়ের একটি—এস্কুইলিনোর চূড়ায় এ ব্যাসিলিকার অবস্থান। রোমের চার পোপীয় ব্যাসিলিকার একটি এটি। এ গির্জার ২৪৬ ফুট লম্বা বেল টাওয়ারটির চূড়া রোমের সর্বোচ্চ বিন্দু।
গির্জাটি নির্মাণের আদেশ দেন পোপ তৃতীয় সিক্সটাস ৪৩১ সালে। এর মোজাইকগুলো সে সময়কার। তবে ভেতরে প্রাচীন রোমান আমলের কলাম আছে, যেগুলো অন্যান্য ভবন থেকে আনা হয়েছে। তবে ব্যাসিলিকাটির বাহ্যিক কাঠামো নির্মিত হয়েছে আঠারো শতকে। জানা যায়, পোপ ফ্রান্সিসের কাছে সান্তা মারিয়া ম্যাজিওরে বেশ আপন জায়গা ছিল। প্রায় রোববারই তিনি সেখানে গিয়ে মাদার মেরিকে সম্মান জানাতেন। প্রতিটি বিদেশ সফরের আগে ও পরে, এমনকি হাসপাতাল থেকে ফেরার পরেও তিনি এই গির্জায় এসে প্রার্থনা করতেন। এ গির্জার মাদার মেরির প্রতিকৃতিকে যিশু মাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিকৃতি হিসেবে দেখা হয়। তার সামনে গিয়ে যাত্রাপথের ও সার্বিক সুরক্ষার জন্য প্রার্থনা করতেন পোপ।
২০১৩ সালে পোপের দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম দিনটি এই গির্জাতেই কাটিয়েছেন ফ্রান্সিস। গত মাসে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও তিনি সরাসরি মাদার মেরির প্রতিকৃতির সামনে এসে ফুল অর্পণ করেন, এরপর ভ্যাটিকানে নিজ বাসভবনে যান।
তবে এখানে সমাহিত হতে যাওয়া প্রথম পোপ ফ্রান্সিস নন। এর আগে আরো সাতজন পোপ এ ব্যাসিলিকায় সমাহিত হয়েছেন। ভ্যাটিকানের বাইরে সর্বশেষ শায়িত পোপ হচ্ছেন ত্রয়োদশ লিও। ১৯০৩ সালে তার মৃত্যুর পর সব পোপই সমাহিত হয়েছেন ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায়।
এদিকে পোপের শেষকৃত্য উপলক্ষে রোমে জনসাধারণের নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। গরম আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে পানির বোতল বিতরণ করা হচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা চেকপোস্ট। রোম শহরজুড়ে ও আকাশপথে মোতায়েন করা হয়েছে সর্বাধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি। যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা, নো-ফ্লাই জোন, জ্যামিং প্রযুক্তি এবং বিমান বাহিনীর নজরদারি। দুই হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য এবং ৪০০ ট্রাফিক পুলিশ কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছেন।
তিনদিন ধরে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় পোপের দেহ সাধারণ মানুষের দেখার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। রেকর্ডসংখ্যক ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ শেষবারের মতো পোপকে দেখার সুযোগ পেয়েছে।










