দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক উত্তেজনাপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সমন্বয় ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কর্মকর্তা রিকি গিল। ভারত-পাকিস্তানের সীমান্ত উত্তেজনা, আফগানিস্তান-পাকিস্তান পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাসহ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ইস্যুতে ওয়াশিংটনের বিভিন্ন দপ্তরের মূল্যায়ন, বার্তা প্রদান ও অবস্থান গুছিয়ে নেয়ার নেপথ্য কাজের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি, সংকট প্রশমন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে কোন মুহূর্তে কী ভাষা ব্যবহার করা হবে, কোথায় সংযম দেখানো হবে, আর কোন বিষয়টিকে সামনে বা আড়ালে রাখা হবে—এসব সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশের কুশীলব হিসেবেই ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছেন তিনি। এ নেপথ্য সমন্বয় ও সংকটকালে অবস্থান গুছিয়ে নেয়ার দক্ষতার কারণেই ওয়াশিংটনের নীতিবৃত্তে রিকি গিলকে এখন দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের একধরনের সংকট সমন্বয়কারী বা ট্রাবলশুটার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী ও হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ডিরেক্টর রিকি গিল একজন ঝানু নীতিপ্রণেতা ও আইন বিশেষজ্ঞ। তিনি এর আগেও মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায় গিলকে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম ‘আর্কিটেক্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গিল কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত হলেও ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী। তবে তিনি ‘রেসিপ্রোসিটি’ বা পারস্পরিক লেনদেনে বিশ্বাস করেন।

চলতি বছর ভারত-পাকিস্তান সংঘাত ও যুদ্ধবিরতিতে ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ‘ডিসটিংগুইশড অ্যাকশন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন রিকি গিল। এর পরই মূলত লাইমলাইটে এসেছেন তিনি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের তৎপরতা কেবল দুই দেশের সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং যুদ্ধবিরতির নেপথ্যে কূটনৈতিক বিশ্লেষণ, বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে নীতির সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া সামলানোর মতো সংবেদনশীল অনেক বিষয় জড়িত ছিল। পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর উত্তেজনার পারদ যখন চড়ছিল, তখন হোয়াইট হাউজের ভেতর বসে মার্কিন প্রশাসনের প্রতিটি পদক্ষেপ আর প্রতিটি শব্দের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন গিল। দিল্লির সংবেদনশীলতা আর ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থ—এ দুইয়ের মাঝের সূক্ষ্ম সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এ কর্মকর্তা।

এনএসসির সাইটেশন অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার সময় তিনি নীতি সমন্বয়, সংযত কূটনৈতিক বার্তা প্রেরণ এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার (ডি-এস্কেলেশন) পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকৌশলকে সমন্বিত কাঠামোয় ধরে রাখার দায়িত্ব পালন করেন। বলা যায়, সংকটের মুহূর্তে কাকে কী বলতে হবে, কীভাবে অবস্থান নরম বা শক্ত রাখতে হবে—এসব বিষয় নিয়ে হোয়াইট হাউজ ও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের ভেতরে যে কাজ হয়েছে, তার একটি বড় অংশের দায়িত্ব ছিল তার ওপর।

ভারতের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির বোঝাপড়াটি হয়েছে সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে, কোনো তৃতীয় দেশের আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতা ছাড়াই। ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানসংক্রান্ত বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ ও মধ্যস্থতার ধারণা নাকচ করে এসেছে। দিল্লির নীতিনির্ধারকেরা বরাবরই বলে আসছেন, এ ধরনের বিষয় কেবল দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান হতে পারে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গেও তারা একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে, রিকি গিল আনুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী ছিলেন না। তিনি যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেননি, কোনো পক্ষের হয়ে শর্ত লিখে দেননি, কিংবা কোনো চুক্তির খসড়া তৈরি করেননি। তার ভূমিকাটি ছিল একেবারেই যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ভেতরের কাজ নিয়ে। কোন দপ্তর থেকে কী তথ্য আসছে, কী ধরনের মূল্যায়ন তৈরি হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সামনে কীভাবে তা উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং বাইরের বিশ্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী ভাষায় প্রকাশ পাচ্ছে—এসব বিষয় সমন্বয় করাই ছিল মূল কাজ।

এ ধরনের সংকটকালে কোনো বিবৃতিতে শব্দ চয়ন সামান্য বদলে যাওয়াও ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আবার আগ্রাসী মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। রিকি গিলের দায়িত্ব ছিল এমন সব ঝুঁকি মাথায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখা। প্রেসিডেন্টের কার্যালয়, পররাষ্ট্র দপ্তর, প্রতিরক্ষা দপ্তর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন এক জায়গায় এনে, সেখান থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভাষা ও অবস্থান নির্ধারণে তিনি কাজ করেছেন। এতে যেমন ভারতের সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে, তেমনি অঞ্চলটির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার দিকও মাথায় রাখা হয়েছে। মোট কথায় গিলের কাজ ছিল পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা। পুরস্কারের ঘোষণায় এ অবদানকেই বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

রিকি গিলের কাজের আরেকটি দিক হলো, তিনি যুদ্ধবিরতির সময় শুধু অঞ্চলের নিরাপত্তা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কূটনৈতিক স্বার্থও বিবেচনায় রেখেছেন। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার। পাকিস্তানও দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও আফগানিস্তান প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে ছিল। এ বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক অবস্থান নিতে হয়, যেখানে কোনো পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক অপ্রয়োজনীয়ভাবে খারাপ না হয়, আবার সংকট পরিস্থিতিতেও দায়িত্বশীল আচরণের বার্তা দেয়া যায়। রিকি গিল সেই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি শব্দ, বিবৃতি ও ইঙ্গিতকে যতটা সম্ভব ঠাণ্ডা ও হিসেবি রাখার চেষ্টা করেছেন।

হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র ডিরেক্টর হিসেবে রিকি গিল ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং আশপাশের অঞ্চল সম্পর্কিত নীতি প্রস্তাব, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণের কাজে যুক্ত। তার পেশাগত পথচলা শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়; আগে তিনি একই পরিষদে রাশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেছেন। সরকারি দায়িত্ব ছাড়াও তিনি একসময় বেসরকারি খাতে নীতিসংক্রান্ত পরামর্শ ও আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন।

পারিবারিকভাবে রিকি গিলের শেকড় পাঞ্জাবি অভিবাসী পরিবারে। জন্ম নিউ জার্সির লোডি শহরে। তার বাবা জসবির গিল ও মা পরম গিল দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস করছেন। রিকি গিল প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জননীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন। পরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।