নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যার দিকে এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত অন্তত ৪০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৮৪ জনই পর্যটক। খবর বিবিসি, রয়টার্স।
স্থানীয় সময় বুধবার সকালে ৮টা ৩৭ মিনিটে অনুভূত একটি ভূমিকম্পের পর তুষারধস নামে। এতে গলিত বরফের পানি দ্রুত পাহাড়ি নদী ‘ভোতে কোশি’তে আছড়ে পড়লে এ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের দুপাশেই উদ্ধার অভিযান চলছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, নেপালের হিমালয় সীমান্তে একটি বিশাল কাদা ও পাথরের স্তর নদীতে ধসে পড়ে। এতে লহেন্দে নদীতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নদীটি নেপাল ও তিব্বতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
দুর্যোগটির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ভূমিকম্পের বিষয়টিও সামনে এসেছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের কারণে পাহাড়ে তুষার ও পাথরের ধস বা অ্যাভালাঞ্চ সৃষ্টি হয়ে বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
আর জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেসও জানিয়েছে, আকস্মিক এ বন্যা ও ভূমিধ্বসের প্রায় সাত মিনিট আগে ওই অঞ্চলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে। আর দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজারাম বাসনেত জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত বন্যায় বেঁচে যাওয়া ৮৮ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি মাইলাং গ্রাম থেকে আরো ১১৫ জনকে উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এছাড়া অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে ১৫টি হেলিকপ্টার যুক্ত করা হয়েছে। তবে অন্ধকার নেমে আসায় নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে চরম বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তাদের জীবন বাঁচানোর লড়াই।
নেপালের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিমুরে, স্যাফ্রোবেসি ও বেত্রাবতী এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষতি হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে সেতু ভেসে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ শেয়ার করা একটি হালনাগাদ তথ্যে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, তারা মোট ৩৮৪ জন পর্যটককে নিখোঁজ হিসেবে শনাক্ত করেছে। এদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশী নাগরিক এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশীদের মধ্যে ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক, ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই), ১৭ জন মালয়েশীয়, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান, ৩ জন আমেরিকান, ১ জন অস্ট্রেলীয় এবং ১ জন ডাচ নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া আরো ১১১ জন নিখোঁজের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকস্মিক এ বন্যায় তাদের আটজন নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নিখোঁজ ব্যক্তিরা ওই এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এ ছাড়া আরো ১০ জন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিক ওই এলাকায় আটকা পড়ে আছেন। তাদের উদ্ধারের জন্য হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে।
এ দুর্যোগের ভয়াবহতাকে 'কল্পনাতীত' বলে বর্ণনা করেছেন নেপালের এক কর্মকর্তা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পাহাড়ি নদীর প্রচণ্ড স্রোত গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ত্রিশূলী থেকে আসা একটি বাসের ভেতর থেকে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, উপত্যকা বেয়ে হু হু করে নেমে আসা আকস্মিক বন্যা থেকে বাঁচতে আতঙ্কিত মানুষজন প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, নদীর পানি দ্রুত ফুলে-ফেঁপে উঠে উপচে পড়ছে। আর সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বাঁচতে হেঁটে, মোটরসাইকেলে এবং অন্যান্য যানবাহনে চড়ে পালানোর চেষ্টা করছেন বহু মানুষ। নদী সংলগ্ন সড়ক ধরে বাসটি এগিয়ে চলার সময় ভেতরের যাত্রীদের আতঙ্কে চিৎকার করতে শোনা যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৫ সালের প্রায় ৯ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটানো ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর এটিই নেপালের সবচেয়ে বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নেপাল-চীন সীমান্তসংলগ্ন বেশ কয়েকটি জেলা এ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ব্যাপক প্রাণহানি ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ বিনষ্ট হয়েছে। তবে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। ভোতে কোশি নদীর তীরবর্তী রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার কয়েকটি লোকালয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাগুলো জনবিরল হলেও সেখানকার সড়কগুলো নেপাল-চীন বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ। দুর্যোগে ওই অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, মহাসড়ক ও সেতুসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে।
দুর্যোগের কারণে তিব্বত অংশও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো অস্পষ্ট। সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা গুয়ান দাওক্সুয়ানের জানিয়েছেন, বুধবার সকালে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছেন। তার স্ত্রী তিব্বতে সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজে নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গুয়ান জানান, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেপালি কর্তৃপক্ষ এলাকাটি পরিদর্শনের জন্য একটি হেলিকপ্টার পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রবল বাতাসের কারণে সেটি দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছে না।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাধ্যমিক দুর্যোগ এড়াতে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আগাম সতর্ক বার্তা চালুর তাগিদ দিয়েছেন তিনি। চীনা সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর জন্য উদ্ধারকারী দলকে তিব্বতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।















