যুক্তরাষ্ট্রের ঝটিকা বিমান ও হেলিকপ্টার হামলার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে আলোচনায় ভেনিজুয়েলা। গতকাল ভোরে মাত্র ২ ঘণ্টার অভিযানের পর বন্দি করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয় দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে। এ ঘটনাকে আখ্যা দেয়া হচ্ছে সাম্প্রতিক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রেজিম চেঞ্জ’ হিসেবে। যেখানে পূর্ণমাত্রার স্থল আক্রমণ ছাড়াই মাত্র ২ ঘণ্টার অপারেশনে ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে বন্দি বানিয়ে তুলে নেয়া হয়েছে।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি তুলনা করা হচ্ছে পানামার স্বৈরশাসক মানুয়েল নোরিয়েগা ও ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের গ্রেফতারের সঙ্গে। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ সামরিক আক্রমণ ও দীর্ঘ অভিযানের পর নেতাদের আটক করা হয়েছিল। ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রে পূর্ণমাত্রার হামলা বা স্থল অভিযান ছাড়াই খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সরাসরি একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে তুলে নিয়ে যাওয়া আধুনিক আমেরিকান সামরিক কৌশলের নতুন নজির বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

মানুয়েল অ্যান্টোনিও নোরিয়েগা ছিলেন পানামার সামরিক গোয়েন্দাপ্রধান ও কার্যত শাসক, যিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত দেশটি নিয়ন্ত্রণ করেন। স্নায়ুযুদ্ধের সময় তিনি একদিকে সিআইএর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন, অন্যদিকে মাদক কার্টেল ও দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ অভিযানে পানামা আক্রমণ করে তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেফতার করে। মানুয়েল নোরিয়েগাকে গ্রেফতার করা কোনো স্বল্পমেয়াদি অভিযান ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ‘অপারেশন জাস্ট কজ’ শুরু হয় ২০ ডিসেম্বর ১৯৮৯-এ। নোরিয়েগা দেড় সপ্তাহেরও বেশি সময় পানামায় ভ্যাটিকান দূতাবাসে আশ্রয় নিয়ে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ৩ জানুয়ারি ১৯৯০-এ আত্মসমর্পণ করেন। অর্থাৎ আক্রমণ শুরুর পর থেকে আত্মসমর্পণ পর্যন্ত সময় লাগে প্রায় ১৩-১৪ দিন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও পানামায় মাদক পাচার ও অর্থ পাচারসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও কারাভোগের পর নোরিয়েগা ২০১৭ সালে পানামা সিটিতেই মৃত্যুবরণ করেন।

সাদ্দাম হোসেন ছিলেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট ও বাথ পার্টির নেতা। যিনি ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসন চালান। তার শাসনামলে ইরান-ইরাক যুদ্ধ, কুয়েত আক্রমণ ও উপসাগরীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ভিন্নমত দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র সমালোচনা কুড়ায়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনে তার সরকারের পতন ঘটে। কয়েক মাস আত্মগোপনের পর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তিকরিতের কাছে এক খামারে ‘মাকড়সার গর্ত’ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০০৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যা ইরাকের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় মোড় হিসেবে বিবেচিত।

এছাড়া বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে বটে, তবে সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানদের সরাসরি তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো অভিযান দেখা যায়নি। যেমনটি ঘটেছে নিকোলাস মাদুরোর ক্ষেত্রে।

ঘটনার শুরু ৩ জানুয়ারি ভোরে। কারাকাসসহ আশপাশ এলাকা আকস্মিকভাবে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে। স্থানীয় সময় রাত ২টা-৩টার মধ্যে রাজধানীজুড়ে অন্তত সাত-নয়টি বিস্ফোরণ ঘটে। যেগুলোর লক্ষ্য ছিল দেশটির বড় সামরিক স্থাপনা। কারাকাসের ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটি, লা কার্লোটা এয়ারবেজ, এমনকি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের সমাধি থাকা কুয়ের্তের দে লা মনতানিয়াও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। আকাশে নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টার, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর দক্ষিণ ও পশ্চিম কারাকাসের একাংশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে রাজধানীজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলায় যুক্ত ছিল অন্তত নয়টি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার। যেগুলো রকেট ও ভারী গোলাবর্ষণ চালায়। ভেনিজুয়েলা সরকার এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব প্রকাশ করেনি। সিবিএস নিউজকে উদ্ধৃত করে কিছু গণমাধ্যম বলছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দিন আগেই এ অভিযানের সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। বড়দিন থেকেই সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল; তবে প্রথমে অগ্রাধিকার পেয়েছিল নাইজেরিয়ায় বিমান হামলা।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনিজুয়েলাকে ঘিরে এ সামরিক পদক্ষেপ হঠাৎ নেয়া সিদ্ধান্ত নয়। দেশটিতে গোপনে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে সিআইএ, এমআই-৬ এবং ইসরায়েলের মোসাদ যৌথভাবে স্থানীয় নেটওয়ার্ক, ‘কাট–আউট’ ও বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ‘গ্রাউন্ড সফটেনিং’-এর কাজ করে এসেছে।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, বৃহৎ আকারের এ বিমান ও হেলিকপ্টার অভিযানের মধ্য দিয়েই মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে দ্রুত গ্রেফতার করে নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়। যেখানে প্রচলিত স্থল অভিযান বা দীর্ঘ দখল নয়, বরং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতের মাধ্যমে এক ধরনের ‘ডেকাপিটেশন স্ট্রাইক’ পরিচালনা করা হয়েছে, যার লক্ষ্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেয়া।