ছাদখোলা লিমুজিনে দাঁড়িয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাহিনীর সদস্যদের অভিবাদন জানান এবং ক্ষেপণাস্ত্র, ট্যাংক, ড্রোনসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ঘুরে দেখেন। ৭০ মিনিটের এই প্রদর্শনীতে ছিল হেলিকপ্টার থেকে ব্যানার নামানো, যুদ্ধবিমানের সুশৃঙ্খল ফ্লাইপাস্ট, ৮০ হাজার শান্তির পায়রা ও রঙিন বেলুন উড়ানোর মতো নানা আয়োজন।

কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আনা হয় নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম, হাইপারসনিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র, নতুন লেজার অস্ত্র এবং ‘রোবট নেকড়ে’ ড্রোন। বিশ্লেষকদের মতে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও অস্থির কূটনীতি অধিকাংশ দেশের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে বৈরী করে তুলেছে, এমন এক সময়ে এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল চীনের সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।

চীনা গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চীনের নতুন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সমুদ্রের জাহাজ লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম, আর কৌশলগত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হামলা চালাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিশেষ করে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের জন্য এসব অস্ত্র উদ্বেগের কারণ। প্রথমবার প্রদর্শিত হয়—এইচকিউ-২৯ স্পেস ডিফেন্স সিস্টেম, যা বিদেশী স্যাটেলাইট ধ্বংস করার ক্ষমতাসম্পন্ন।

এবার তিন ধরনের পারমাণবিক সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেখিয়েছে চীন—ডং ফেং বা ডিএফ-৬১, ডিএফ-৩১বিজে ও ডিএফ-৫সি। এর মধ্যে ডিএফ-৫সি ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি এবং এটি একসঙ্গে ১২টি ওয়ারহেড বহন করতে পারে। আকাশ থেকে আঘাত হানতে সক্ষম পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র জেএল–১-ও উন্মোচন করা হয়। জেএল-১, জেএল-৩ এবং ডিএফ-৬১, ডিএফ-৩১ মিলে চীনের ‘স্থল, সমুদ্র ও আকাশভিত্তিক পারমাণবিক ট্রায়াড’ প্রথমবার একসঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, চীন প্রথমবারের মতো হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল ওয়াইজে–১৭ ও হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ওয়াইজে-১৯ প্রকাশ করেছে। ‘ইয়িং জি’ বা ‘ঈগল অ্যাটাক’ নামের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জাহাজ বা বিমান থেকে ছোঁড়া যায় এবং বড় ধরনের জাহাজ ধ্বংস করতে সক্ষম। কুচকাওয়াজে প্রথম দেখা গেছে পানির নিচে থেকে আঘাত হানতে সক্ষম বড় আকারের স্বয়ংক্রিয় ড্রোন এজেএক্স-০০২, যা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

এদিকে চীনে কুচকাওয়াজ চলাকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ পোস্ট করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চীনকে রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ব্যঙ্গ করে তিনি লেখেন, ‘প্লিজ, ভ্লাদিমির পুতিন ও কিম জং উনকে আমার উষ্ণ শুভেচ্ছা পৌঁছে দিন, যখন আপনারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।’ পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, কুচকাওয়াজকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ মনে করছেন না এবং প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘ভালো’।

জাপান সরকারের শীর্ষ মুখপাত্র কুচকাওয়াজ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও জানিয়েছেন, এশিয়ার শীর্ষ দুই অর্থনীতি গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলছে।

শি, পুতিন ও কিম নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার কোনো ইঙ্গিত দিয়েছেন কিনা—সে দিকেও পর্যবেক্ষকদের নজর ছিল। যদিও আলাদাভাবে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আছে, তবে তিন দেশ মিলে নেটোর মতো কোনো চুক্তি তাদের নেই। বিশ্লেষকদের মতে, তেমন কোনো চুক্তি হলে তা এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলসহ বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারত।

—মুহাম্মাদ শাখাওয়াত হুসাইন