সুইজারল্যান্ডে আজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নসংক্রান্ত আলোচনা। তবে আপাতত সেই আলোচনা হচ্ছে না। একই সময়ে হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছে। যদিও ইরানের শর্ত অনুযায়ী, এ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ করতে হবে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

সুইজারল্যান্ডের অব্যুর্গেনে আলোচনা শুরুর কথা ছিল। এর মাত্র দুই দিন আগে উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, তারা ‘যত দ্রুত সম্ভব কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরুর’ প্রত্যাশা করছে। তবে একই সঙ্গে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে আলোচনার নেতৃত্ব দেয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আর সুইজারল্যান্ড সফরে যাচ্ছেন না।

গতকাল রাতে হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র বলেন, ‘এই আলোচনার লজিস্টিক ব্যবস্থা কখনোই সহজ বা পূর্বানুমানযোগ্য ছিল না। আপাতত ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ রাতে রওনা হচ্ছেন না।’

আলোচনা বাতিলের ঘটনা ঘটে এমন এক সময়, যখন ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে সহিংস সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।

গতকাল রাতে হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীকে লক্ষ্য করে একাধিক রকেট হামলা চালায়। দিনের বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণের পর এ হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইসরায়েল নাবাতিয়েহ ও আশপাশের শহরগুলোয় ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। ইসরায়েলের দাবি, হামলাগুলো হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে করা হয়েছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এতে অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছেন।

হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, তারা নাবাতিয়েহর পার্বত্য পাদদেশের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করা ইসরায়েলি বাহিনীকে লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকেই এলাকাটি সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। যুদ্ধবিরতির আগে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ওই শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।

আলোচনা বাতিল হওয়ার আগে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছিল, পরবর্তী দফার শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার আগে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নের বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়। একই সঙ্গে তারা বলেছিল, ইরানি প্রতিনিধিদল জেনেভায় যাবে কিনা, সে বিষয়েও তখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হয়নি।

আলোচনা বাতিলের আগে আল-মায়াদিন টেলিভিশনও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ইরান-সমর্থিত লেবাননি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত এই আরবি ভাষার সংবাদমাধ্যমটি জানায়, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে তেহরান তাদের প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে পাঠানো বিলম্বিত করছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি থেকে নিজেকে দূরে রেখেছে শান্তি আলোচনায় অংশ না নেয়া ইসরায়েল। লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে এবং শুক্রবার ভোরেও নতুন বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে। তবে হিজবুল্লাহ একই অভিযোগ ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও তুলেছে।

শুক্রবার হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তাদের যোদ্ধারা দক্ষিণ লেবাননে তিনটি ইসরায়েলি ট্যাংক ধ্বংস করেছে এবং সংঘর্ষ এখনো চলছে। যদিও ট্যাংকগুলোয় হামলার বিষয়টি ইসরায়েল নিশ্চিত করেনি।

মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহ লেবাননকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলে। এর পর ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবানন অভিযান ও বোমা হামলায় দেশটিতে ৩ হাজার ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর হামলায় লেবাননে অন্তত ৩২ জন ইসরায়েলি সেনা ও তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে তাদের ঘোষিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ প্রকাশ করে, যার মধ্যে রয়েছে লেবাননের শত শত বর্গমাইল ভূখণ্ড। লেবাননের কর্মকর্তারা ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার দাবি করেছেন। ইরানও বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার প্রয়োজন।

সমঝোতা স্মারকে লেবাননের যুদ্ধের ‘স্থায়ী সমাপ্তি’ এবং দেশটির ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি সব ফ্রন্টে পূর্ণ যুদ্ধবিরতি প্রত্যাশা করেন।

তবে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা ট্রাম্প ও ভ্যান্সের প্রকাশ্য সমালোচনার মুখে পড়েছে। গতকাল ভ্যান্স বলেন, শান্তি প্রক্রিয়াকে ইসরায়েলের সম্মান করা উচিত।