আবারো সংঘাতের মুখোমুখি পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর পাল্টাপাল্টি উদ্যোগ পরিস্থিতিকে ক্রমেই উত্তপ্ত করে তুলছে। উভয় দেশের মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপ, আকাশসীমা বন্ধ, কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত এবং বাণিজ্য ও সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিতের ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে তুলছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ভারত-পাকিস্তানের এ নতুন উত্তেজনা সংঘাতে রূপ নিলে তা শুধু দুদেশের জন্যই নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অস্থিরতা ডেকে আনতে পারে। কূটনৈতিক যোগাযোগহীনতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে বলে তারা সতর্ক করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ সংকট ২০১৯ সালের ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত সংঘাতকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামের একটি পর্যটন এলাকায় সোমবার সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলাকে কেন্দ্র করে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের এ আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। হামলায় অন্তত দুই ডজন ভারতীয় নাগরিক নিহত হয়। ভারত সরকারিভাবে এখনো হামলার পেছনে কোনো গোষ্ঠীর নাম উল্লেখ করেনি। তবে পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে এ হামলার জন্য দায়ী করে নয়াদিল্লি একের পর এক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয়। সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত, আটারি-ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ, পাকিস্তানের হাইকমিশনে নিযুক্ত সামরিক উপদেষ্টাদের বহিষ্কার ও মিশনের কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমিয়ে আনে। একই সঙ্গে পাকিস্তানিদের ভিসাও বাতিল করা হয়।

পাকিস্তান সরকার ভারতের এসব পদক্ষেপকে ‘একতরফা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করেছে। গতকালই ইসলামাবাদ ভারতের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা ঘোষণা করে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ, ভারতীয় কূটনীতিকদের সংখ্যা কমানোর নির্দেশ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্থগিত করা। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের পানি চুক্তি বাতিলের হুমকিকে ‘যুদ্ধের ঘোষণার সমতুল্য’ বলে উল্লেখ করেছে। পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী বেশির ভাগ কৃষিকাজ সিন্ধু নদের পানির ওপর নির্ভরশীল, যা ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পাকিস্তানে আসে।

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক নাজমুস সাকিব বলেন, ‘এ সংঘাত আগামী সপ্তাহ ও মাসগুলোতে আরো বাড়তে পারে, যা এরই মধ্যে অস্থিতিশীল এ অঞ্চলকে সম্পূর্ণ অস্থির করে তুলতে পারে।’

২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত পাকিস্তানের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছিল। এর জবাবে পাকিস্তান ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে এক পাইলটকে গ্রেফতার করে। পরে তাকে ফেরত দেয়া হলে উত্তেজনা কিছুটা কমে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসলামাবাদভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সৈয়দ মুহাম্মদ আলী বলেন, ‘ভারত ২০১৯-এর চেয়ে বড় আকারে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে। তারা এ হামলাকে কাজে লাগিয়ে কাশ্মীর ইস্যুকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চাইছে।’

পাকিস্তানের সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ সাঈদ মিনহাস জিইও টিভিকে বলেন, ‘ভারত কোনো প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে দোষারোপ করছে। মনে হচ্ছে তারা আবার হামলা চালানোর সুযোগ খুঁজছে। ২০১৯ সালে আমরা অভিনন্দনকে (পাইলট) চা খেতে দিয়েছিলাম, এবার বিস্কুটও দিতে পারি।’

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ আসফান্দিয়ার মির বলেছেন, ‘দুই দেশের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগের অবকাঠামো এখন নেই, যা অতীতে সংকট নিরসনে সাহায্য করত। এর অনুপস্থিতি ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

এক জ্যেষ্ঠ পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে যেকোনো পাল্টাপাল্টি উত্তেজনার বিষয়টি আমরা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করব, তবে ভারত যদি কোনো আগ্রাসনের চেষ্টা করে, তাহলে তা প্রতিহত করা হবে।’

সাবেক পাকিস্তানি তথ্যমন্ত্রী মুরতাজা সোলাঙ্গি সতর্ক করে বলেছেন, ‘২০১৯ সালে দুই দেশই ভাগ্যক্রমে যুদ্ধ এড়াতে পেরেছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক। বৈশ্বিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, ভারতীয় মিডিয়াও অতিমাত্রায় উসকানিমূলক আচরণ করছে। মোদি সরকার যদি যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত না নেয়, দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

এ সংকটের মধ্যেই পাকিস্তান ও ভারতের সেনাবাহিনী লাইন অব কন্ট্রোলে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারতীয় সেনা সমাবেশের কোনো প্রমাণ এখনো তারা পাননি, যদি তারা কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নেয় পাকিস্তানও ছেড়ে কথা বলবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ উত্তেজনা যদি সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে তা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি বদলে দেবে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সহজ সমাধানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নিউইয়র্ক টাইমস।