ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথি এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। যুদ্ধের প্রভাবে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শিশুকে পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের ভরণপোষণে কাজে নামতে হচ্ছে।

গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, তাইজের আল-ওয়াজিয়াহ জেলার ১৩ বছর বয়সী মুনির ফারি আগে সকালে স্কুলে যেত এবং বিকালে বাবাকে গবাদিপশু পালনে সহায়তা করত। কৃষক পরিবারের প্রথম শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে তার গ্রামের কাছাকাছি সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শ্রেণিকক্ষে পাঠ চলার সময় দূর থেকে ভেসে আসত বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দ। একপর্যায়ে তাদের বাড়িই নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের সম্মুখভাগে পড়ে।

মুনির জানায়, আশপাশের এলাকায় লড়াই শুরু হওয়ার খবর তারা শুনেছিল, কিন্তু এত দ্রুত তা তাদের গ্রামে পৌঁছে যাবে, তা ভাবেনি। সংঘর্ষের শব্দ কাছে আসতেই ভোরে গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে পরিবারসহ বাড়ি ছাড়ে তারা। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে গিয়ে তাইজের আল-শিমায়াতিন এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের জন্য তৈরি একটি শিবিরে আশ্রয় নেয় পরিবারটি। সেখানে পৌঁছানোর সময় তাদের হাতে কোনো টাকা ছিল না, এমনকি প্রয়োজনীয় মৌলিক সামগ্রীও ছিল না।

সেপ্টেম্বরে হুথিরা নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করার পর ইয়েমেনে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এ সময় হুথিরা দ্রুত দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের উপকূলের কয়েকটি শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর মধ্য দিয়ে কয়েক বছর ধরে চলা তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইয়েমেনের বিভিন্ন যুদ্ধফ্রন্ট মোটামুটি একই অবস্থানে ছিল।

এখন তাইজের উপকণ্ঠে কৌশলগত উঁচু এলাকা ও সরবরাহপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর লড়াই চলছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের বিমান হামলাও চলছে। বিমান হামলা ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে বাঁচতে বহু বেসামরিক মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন।

মুনির ও তার ভাই এখন পড়াশোনার বদলে বাস্তুচ্যুতদের শিবিরের বাইরে বাজারে মোজা ও অন্যান্য সস্তা পণ্য বিক্রি করে। তাদের শ্রেণিকক্ষের জায়গা নিয়েছে একটি ছোট তাঁবু, যেখানে বাবা-মা ও পাঁচ ভাইবোনের সঙ্গে গাদাগাদি করে রাত কাটাতে হয়। চলতি মাসের নতুন সংঘাত শুরুর আগেই ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের কারণে ৩২ লাখের বেশি শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছিল।

তার বাবা গালেব ফারি জানান, শিবিরে পরিবারকে টিকিয়ে রাখতে ছেলেদের কাজে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। শিবিরটি সাময়িক আশ্রয় হবে এবং দ্রুত গ্রামে ফিরতে পারবেন—এমন আশা থাকলেও প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ শিবিরে আসায় সেই আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

তাইজের মুসাব ইবনে উমায়ের স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুল ওয়াসিয়া আবদু যতদিন সম্ভব স্কুল খোলা রাখার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে শিশুরা অন্তত কিছুটা স্বাভাবিক জীবন পায়। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে শিক্ষার্থীদের চোখের সামনে স্কুলের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরিত হলে সেই পরিস্থিতিও বদলে যায়।

আবদু জানান, বিস্ফোরণের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কান্না করছিল, কেউ চিৎকার করছিল। বিস্ফোরণের তীব্রতায় কয়েকজন শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরে স্কুলটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি। এতে ৬০০-এর বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তাইজের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তর—তিন দিকেই সংঘাত চলায় এখনই স্কুল খুলে দেয়ার মতো পরিস্থিতি নেই বলে জানান আবদু। তার আশঙ্কা, স্কুলের বাইরে থাকা ও বাস্তুচ্যুত শিশুদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হতে পারে।

বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। তাইজ শহরের ৫৬ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি এসাম নাবিল বলেন, সামরিক উত্তেজনার মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই। পণ্য সহজে শহরে পৌঁছাতে না পারায় তাইজের বাসিন্দাদের ওপর চাপ আরো বেশি পড়ছে।