বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের পানীয় জল ও খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মিঠাপানির ভাণ্ডারে ক্রমেই ঢুকে পড়ছে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি। এ সংকট কোনো হঠাৎ দুর্যোগ নয়; এটি ধীর ও দীর্ঘমেয়াদী মারাত্মক এক জলবায়ু বিপর্যয়—যাকে বলা হচ্ছে সল্টওয়াটার ইনট্রুশন বা লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় ধীরে ধীরে স্থলভাগের মিঠাপানির ভূগর্ভস্থ জলাধারে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ার প্রক্রিয়াই সল্টওয়াটার ইনট্রুশন।

দ্য গাম্বিয়া, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির দেশগুলো এ সংকটে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হলেও এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সব মহাদেশেই উপকূল থেকে অন্তত ১ কিলোমিটার ভেতরে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ ঘটবে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্সে পানির স্বাদ হয়ে গেছে নোনতা। বাংলাদেশে বহু কৃষক একসময়কার উর্বর ফসলী জমিকে লবণাক্ত ঘেরে রূপান্তর করে চিংড়ি চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর গাম্বিয়ায় লবণাক্ত পানির প্রভাবে ফসলের মাঠ হয়ে উঠছে অনাবাদি। বিজ্ঞানীরা একে ‘ধীরগতির জলবায়ু সংকট’ বলে অভিহিত করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টার্ন ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রবার্ট ইয়াং বলেন,
‘সল্টওয়াটার ইনট্রুশন ধীরগতির জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। আমরা ঝড়ের মতো বড় দুর্যোগ নিয়ে বেশি চিন্তা করি, কিন্তু এ ধীর পরিবর্তনগুলোই ভবিষ্যতে উপকূলীয় জনপদের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর।’

ডেলাওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞ হলি মাইকেল বলেন, ‘সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর স্থলভাগের পানির স্তরের ভারসাম্য বদলালেই লবণাক্ত পানি ভেতরে ঢুকে পড়ে।’

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও তাপমাত্রা বৃদ্ধিই এ ভারসাম্য নষ্ট করছে।

বিশ্বের দরিদ্র উপকূলীয় কৃষকরাই এ সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। দ্য গাম্বিয়ার সানকান্দি গ্রামের কৃষক নার্স সেন্নে কয়েক প্রজন্ম ধরে ধান চাষ করতেন। কিন্তু চার বছর আগে আটলান্টিক মহাসাগরের লবণাক্ত পানি ধীরে ধীরে তাদের এক জমিতে ঢুকে পড়ে। ফসলের বৃদ্ধি থেমে যায়, ফলন কমে আসে। একাধিকবার কাদা ও বালির বস্তা দিয়ে বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত জমিতে চাষাবাদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

গাম্বিয়া নদী দেশটির প্রধান মিঠাপানির উৎস। তবে নদীটি প্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান উচ্চতায় হওয়ায় লবণাক্ত পানি ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ১৯৭০-এর দশক থেকে দেশটিতে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে গাম্বিয়ায় ধান চাষের জমি কমেছে ৪২ শতাংশ আর উৎপাদন কমেছে ২৬ শতাংশ। অথচ দেশটির চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৯১ শতাংশই কৃষক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লবণাক্ততা ঠেকাতে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ফ্লোরিডায় খালগুলোয় টাইড গেট বসানো হয়েছে। ভিয়েতনামের মেকং ডেল্টায় নির্মিত হয়েছে ব্যয়বহুল স্লুইস গেট। চীন ও নেদারল্যান্ডসে বর্জ্য পানি পরিশোধন করে নদীতে ছাড়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে লবণাক্ত জমিতে চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন। যা জমিতে আরো লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সমস্যার কোনো একক সমাধান নেই।

২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৭৭ শতাংশ উপকূলীয় অঞ্চল লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়বে। এর অর্থ—কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও জীবিকা হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের এ ধীর কিন্তু ভয়াবহ অভিঘাত মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উপকূলীয় জনপদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে বলে অভিমত সংশ্লিষ্টদের।