বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে নজিরবিহীন সাইবার হামলায় প্রায় ৬৩০ কোটি বা ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়েছে। ব্লকচেইনের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্র প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ বাইন্যান্সের লেনদেন ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ওয়ালেট থেকে হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে সরিয়ে নেয়া হয়। চুরির পর বাইন্যান্স সাময়িকভাবে অর্থ উত্তোলন বন্ধ করেছে এবং গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে জানিয়ে ক্ষতির পুরোটা নিজস্ব তহবিল থেকে পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ঘটনাটিকে এরই মধ্যে ক্রিপ্টো খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চুরি হিসেবে বর্ণনা করছেন বিশ্লেষকরা। ব্রিটিশ ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এলিপটিক বলছে, এটি শুধু ক্রিপ্টো খাতেই নয়, যেকোনো ধরনের সবচেয়ে বড় একক চুরির ঘটনা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিস হামলার ধরন বিশ্লেষণ করে এর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকারদের পূর্ববর্তী কর্মকাণ্ডের মিল পেয়েছে। তবে বাইন্যান্সের নিজস্ব তদন্তে এখনো হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি।

বাইন্যান্স জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে তাদের একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ওই কম্পিউটার ব্যবহার করে হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানের একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশ এবং অননুমোদিত অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পেয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে তদন্তে আরো কয়েকটি নিরাপত্তা লঙ্ঘনের জায়গা শনাক্ত হয়েছে। ফলে কেবল একটি ল্যাপটপ হ্যাকই পুরো ঘটনার কারণ কিনা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের ‘সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা লেনদেন অনুমোদনের প্রযুক্তিগত কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে তারা এমন নির্দেশ পাঠাতে পেরেছে, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ওয়ালেটগুলো থেকে সম্পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যাকারদের ওয়ালেটে চলে যায়। একজন ক্রিপ্টো আইন বিশেষজ্ঞ পরিস্থিতিটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, হামলাকারীরা হয়তো সরাসরি ভল্টের চাবি চুরি করেনি; বরং যে ব্যবস্থা ভল্টকে অর্থ ছাড়ার নির্দেশ দেয়, সেটিই দখল করে নিয়েছিল।

ব্লকচেইন রেকর্ড অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে মূল চুরির ঘটনা শুরু হয় এবং প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যেই বেশির ভাগ সম্পদ সরিয়ে ফেলা হয়। অর্থ স্থানান্তরের পর হামলাকারীরা দ্রুত সেগুলো বিভিন্ন ডিজিটাল সম্পদে রূপান্তর ও অন্য ওয়ালেটে পাঠানোর চেষ্টা করে, যাতে বাইন্যান্স, স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পদগুলো জব্দ করতে না পারে।

তবে চুরি হওয়া অর্থের একটি বড় অংশ আটকে দিতে পেরেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে ইউএসডিটি ও ইউএসডিসির মতো স্টেবলকয়েনের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এসব টোকেন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট ওয়ালেটে থাকা সম্পদ দূর থেকে ফ্রিজ করতে পারে। টিথার, সার্কেল, রিপল এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ আটকে দিয়েছে। বাইন্যান্স জানিয়েছে, প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ এরই মধ্যে ফ্রিজ করেছে। টিথার একাই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করেছে। সার্কেল আটকে দিয়েছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি। এছাড়া রিপল প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আরো কিছু টোকেন জব্দ করেছে বলে বাইন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হে জানিয়েছেন।

তবে সব সম্পদ উদ্ধার করা সহজ হবে না। এলিপটিকের হিসাবে প্রায় ৩৩০ কোটি ডলারের চুরি হওয়া সম্পদ এমন ডিজিটাল মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়েছে, যেগুলো ইস্যুকারী কোনো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে না। বিশেষ করে বিটকয়েন ও ইথারের মতো সম্পদ একবার হ্যাকারদের ব্যক্তিগত ওয়ালেটে চলে গেলে কোনো কোম্পানি সেগুলো সরাসরি ফ্রিজ করতে পারে না। টিআরএম ল্যাবসের হিসাবে প্রায় ২৪০ কোটি ডলার মূল্যের বিটকয়েন ও ইথার বর্তমানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হ্যাকাররা এসব সম্পদ বিভিন্ন ওয়ালেটে ভাগ করে, অপরিচিত টোকেনে রূপান্তর করে কিংবা তথাকথিত ‘মিক্সিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে অর্থের গতিপথ আড়াল করার চেষ্টা করতে পারে। তবে সময় যত যাবে, এসব সম্পদ নগদায়ন করা তত কঠিন হতে পারে। কারণ ব্লকচেইনে লেনদেনের রেকর্ড স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে এবং চুরি হওয়া ওয়ালেটগুলোর ঠিকানা দ্রুত বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কালো তালিকায় চলে যায়।

বাইন্যান্সের দাবি, গ্রাহকদের অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬৩৪ কোটি ডলারের নিজস্ব অর্থ আলাদা করে রেখেছে ক্ষতি পূরণের জন্য। এর মধ্যে বড় অংশ সংশ্লিষ্ট টোকেনেই রাখা রয়েছে। পাশাপাশি বাইন্যান্সের প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বিটকয়েনভিত্তিক ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স’ বা জরুরি রিজার্ভও রয়েছে, যা নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় গ্রাহকদের সুরক্ষা দিতে তৈরি করা হয়েছিল। বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং গ্রাহকদের উদ্দেশে জানান, তাদের অর্থ নিরাপদ এবং পুরো ক্ষতি প্রতিষ্ঠান বহন করবে।

ঘটনার পর বাইন্যান্স সাময়িকভাবে সব ধরনের অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা শেষে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তোলন সেবা আবার চালুর আশা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ও ইউএস সিক্রেট সার্ভিসের সঙ্গে বাইন্যান্স কাজ করছে বলে ঘটনার বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে।

বাইন্যান্সের ওপর এ হামলার পর বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টো বাজারেও চাপ তৈরি হয়। বিটকয়েনের দাম নেমে আসে ছয় সপ্তাহের সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে। ইথারের দাম ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে পৌঁছায়।

ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন উচ্চ সুদের হার ও এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা দুর্বল হওয়ার কারণে ক্রিপ্টো বাজার আগে থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ ধরনের বড় নিরাপত্তা লঙ্ঘন কেন্দ্রীয় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে সম্পদ রাখার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে।

বাইন্যান্সের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারী প্রায় ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। তাদের হেফাজতে তখন প্রায় ১৬২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছিল।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্র-সমর্থিত হ্যাকাররা দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশী আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ক্রিপ্টো প্লাটফর্মে হামলার অভিযোগের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, পিয়ংইয়ং সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ও আর্থিক চুরির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করে। তবে উত্তর কোরিয়া বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।