বছরের শুরুতেই নতুন ট্যারিফ কার্যকরের পর চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটেছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) বন্দরটি আয় করেছে ৫ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিপরীতে রাজস্ব ব্যয় কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। চলতি বছরের আরো তিন মাস বাকি থাকতেই গত বছরের পুরো সময়ের আয়ের রেকর্ড ছাড়িয়েছে বন্দরটি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) দাবি, ট্যারিফ বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো, ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ব্যয় সংকোচনের ফলে এ সাফল্য এসেছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, রাজস্ব আয় বাড়ার বড় কারণ অস্বাভাবিক মাশুল বৃদ্ধি। তাদের মতে, শুধু আয় বাড়ানোকে বন্দরের সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বরং সেবার মানোন্নয়ন, পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় কমানো এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যয় সহনীয় রাখাই প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
চবকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে কনটেইনার ও বাল্ক কার্গোসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহনে আয় হয়েছে ৫ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে বন্দরটি আয় করেছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। এ হিসাবে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই, আগের বছরের পুরো সময়ের তুলনায় ৩১৪ কোটি টাকা বেশি আয় হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে বন্দরের রাজস্ব ব্যয় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যয় কমেছে ৩৫ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালের পুরো বছরে বন্দরের রাজস্ব ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজস্ব আয় বৃদ্ধিতে ট্যারিফের ভূমিকা থাকলেও পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ে কাগজবিহীন কার্যক্রম, অনলাইন ও ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণে জোর দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা, মেরামত ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও কঠোরভাবে তদারক করা হয়েছে।’ একই ব্যয়ে বেশি কাজ আদায়ের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম বলেন, ‘আগের বছরগুলোয় গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বড় ধরনের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের কার্যকাল ১৫-২০ বছর হওয়ায় চলতি বছর নতুন কেনাকাটার প্রয়োজন কমেছে। ফলে ব্যয়ও কমেছে।’
এদিকে বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়লেও ট্যারিফ বৃদ্ধিতে আমদানি-রফতানির ব্যয় বেড়েছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে বছরে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা মূল্যের পণ্যের শুল্কায়ন হয়। এ হিসাবের মধ্যে জাহাজ ভাড়া ও বীমার মতো ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত।
সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বছরের শুরু থেকেই ট্যারিফের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ও এর বাস্তবায়নের কারণে বন্দরের আয় বেড়েছে। তবে আয়ের এ ধরনের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কখনই প্রধান লক্ষ্য হতে পারে না। বন্দর ব্যবহারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী সেবার মান বাড়ানো ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় সহনীয় রাখাই বন্দরের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’
তিনি বলেন, ‘বন্দরের সেবা উন্নত হলে শিল্প-কারখানার কাঁচামাল দ্রুত ওঠানো-নামানো ও খালাস সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন কার্যক্রমে গতি আসবে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমবে। ট্যারিফ বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধি করা হলে বন্দর ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। তাই সাফল্য মূল্যায়নে রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সেবার মান, কার্যক্রমের গতি ও ব্যবহারকারীদের ব্যয় বিবেচনায় নেয়া জরুরি।’
আমিরুল হক আরো বলেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী ছয় মাস পর থেকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশী অপারেটরের কাছে যাওয়ার কথা। বন্দরের অন্য টার্মিনালগুলোও বেসরকারি খাতে পরিচালনার উদ্যোগ রয়েছে। ফলে নতুন ট্যারিফের সুবিধা ভবিষ্যতে বেসরকারি অপারেটরদের অনুকূলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটির মাধ্যমে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের নথি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বন্দরের চুক্তিতে কনটেইনারপ্রতি মোট আয়ের ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ পাবে চবক। এদিকে এনসিটি ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের পাশাপাশি চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনা নিয়েও উদ্যোগ চলছে। সিসিটি দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার জন্য ইজারা দেয়ার প্রক্রিয়ায় আগ্রহ দেখিয়েছে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালস (আরএসজিটি)। এ প্রতিযোগিতায় রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও।
ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ও সিসিটিকে একীভূত করে পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে আরএসজিটি সিসিটি ও জিসিবিকে একীভূত করে পরিচালনার পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ৬০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বিনিয়োগে বছরে ১৮ লাখ একক কনটেইনার ও ৫০ লাখ টন পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা তৈরি সম্ভব হবে। তবে এ দুই টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা কাঠামো নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, ‘এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের কাছে হস্তান্তরে ছয় মাসের রূপান্তরকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর সিসিটি ও জিসিবি চট্টগ্রাম বন্দরের সরাসরি পরিচালনায় থাকবে।’










