অনাবৃষ্টির কারণে নোয়াখালীতে আমনের আবাদে দেখা দিয়েছে পানি সংকট। এতে মাঠ ফেটে চৌচির হয়েছে, ঝলসে গেছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। ফলে চলতি মৌসুমে জেলায় আমনের ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে একদিকে খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে, তেমনি বড় লোকসানের মুখে পড়বে কৃষক। গবেষকদের মতে, এখনই চাষ পদ্ধতি উন্নতির পাশাপাশি স্বল্পদৈর্ঘ্যের জীবৎকাল ও লবণসহিষ্ণু জাত সম্প্রসারণ করা জরুরি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৭০ হাজার ৬২২ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদ হয়েছে। এসব জমিতে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯৫০ টন ধান উৎপাদন হওয়ার কথা। অধিদপ্তর আরো জানায়, আশার চেয়েও আবাদ হয়েছে বেশি। কিন্তু অনাবৃষ্টির কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে ফসলের কী পরিমাণ ক্ষতি হবে তার সঠিক হিসাব এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তারা।
সুবর্ণচরের কয়েকটি ইউনিয়নের মাঠ সরজমিনে দেখা যায়, জমির মাটি ফেটে চৌচির অবস্থা, ধানগাছ ঝলসে গেছে। প্রথম দেখায় মনে হয়, শত্রুদের দেয়া আগুনে পুড়েছে এসব ধান।
কৃষকরা জানান, এ বছর জুলাইয়ে অতিবৃষ্টির কারণে তারা নির্দিষ্ট সময়ে আবাদ করতে পারেননি। আবার যখন গাছে ধান আসার কথা, তখন বৃষ্টি না থাকায় দেখা দিয়েছে পানিশূন্যতা। বিশেষ করে আগস্টের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বৃষ্টিই হয়নি। ফলে খেতের ফসল ঝলসে গেছে, মাটি ফেটে গেছে। কেউ কেউ সেচ দিয়ে কিছু ফসল রক্ষা করতে পারলেও বেশির ভাগ কৃষকই তা পারেননি। আশপাশের খাল ও পুকুরেও নেই পর্যাপ্ত পানি। এ পরিস্থিতিতে ফলনের আশা ছেড়ে দিয়েছেন তারা।
কথা হয় সুবর্ণচর উপজেলার চরওয়াপদা গ্রামের কৃষক মো. মুরাদ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি এবার সাত একর জমিতে রোপা আমন আবাদ করেন। কিন্তু দুই মাসের বেশি সময় ধরে বৃষ্টি না থাকায় তার সাড়ে তিন একর জমির ফসলই ঝলসে গেছে। যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তাতেও আশানুরূপ ফলন নেই। আবাদে তার অন্তত সোয়া ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ব্যাংক ঋণ ও সুদে টাকা নিয়ে চাষ করা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।
মুরাদ উদ্দিন বলেন, ‘প্রথম দিকে ধানগাছের কয়েকটি পাতা মোড়াতে শুরু করেছিল। ভেবেছিলাম পোকায় আক্রমণ করেছে। পরে জমি ঘুরে অন্যান্য মোড়ানো পাতা খুলে দেখি কোনো পোকা নেই। কয়েক দিন যেতে না যেতেই এভাবে পুরো জমি আক্রান্ত হলো। এক পর্যায়ে দেখতে পাই—জমির মাটি ফেটে গেছে, লবণাক্ততা দেখা দিয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে জমির ধানগুলো ঝলসে যেতে শুরু করে।’
শুধু কৃষক মুরাদের খেত নয়, এমন দশা চোখে পড়ে সুবর্ণচর উপজেলার সব ইউনিয়নের মাঠেই। এছাড়া জেলার কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট ও হাতিয়া উপজেলার মাঠের চিত্রও প্রায় একই।
আমান উল্যাহ ইউনিয়নের কৃষক মো. কামাল উদ্দিন জানান, তিনি এ বছর আট একর জমিতে আমন আবাদ করেছেন। এরই মধ্যে অন্তত দুই একর জমির ফসল সম্পূর্ণ ঝলসে গেছে। বাকি ছয় একর জমিতে ধানের পেটে কিছু নেই। লক্ষণ দেখে বোঝা যাচ্ছে এগুলো চিটাই পরিণত হবে। তিনি জানান, ফলন ভালো হলে এ বছর অন্তত ৪০০ মণ ধান উৎপাদন হতো তার জমি থেকে। এখন এর অর্ধেকও হবে না। এতে তিনি যেমন লোকসানে পড়ছেন, তেমনি পরিবার-পরিজন নিয়ে নানা সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে তার।
কৃষকদের দাবি, নিজেদের অনভিজ্ঞতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন না বোঝা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের সঠিক পরামর্শ না পাওয়ায় গতানুগতিক কৃষিতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের নোয়াখালী অঞ্চলের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আ হা মো. আমীর ফয়সাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পরবর্তী সময়ে এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপযোগী স্বল্পমেয়াদি ও লবণাক্ততা সহনশীল জাত ব্যবহার, উঁচু স্থানে মানসম্মত বীজতলা তৈরি, সময়মতো চারা রোপণ এবং অতিবৃষ্টিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি খাল পুনঃখননের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে অনাবৃষ্টির সময়ে সেচের জন্য পানি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নোয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আশীষ কুমার কর বলেন, ‘ভবিষ্যতে পানির প্রাকৃতিক উৎস বাড়ানো ও লবণসহিষ্ণু জাত আবাদে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ব্লক ওয়ারি গ্রুপের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত সমাবেশ করা হচ্ছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি ও লবণসহিষ্ণু জাতগুলোতে ফলন তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকরা এতে কম আগ্রহী। এর পরও বারবার কৃষককে উৎসাহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে গবেষণা বিভাগের সঙ্গেও নিয়মিত বৈঠক করে নতুন জাত উদ্ভাবনের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’ চলতি বছর আমনে যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাদের রবি মৌসুমে বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আনা হবে বলেও জানান তিনি।










