ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) হাজারীবাগে ৮১ কোটি টাকা ও কাপ্তানবাজারে ৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি আধুনিক পশু জবাইখানার কার্যক্রম কার্যত অচল। হাজারীবাগের জবাইখানাটি সম্প্রতি সীমিত পরিসরে চালু হলেও কাপ্তানবাজারেরটি নির্মাণের পর থেকে একদিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে নতুন একটি আধুনিক পশু জবাইখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বিদ্যমান স্থাপনাগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে নতুন প্রকল্প নিলে তা কতটা সুফল বয়ে আনবে, সে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে মোহাম্মদপুরে আধুনিক জবাইখানা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, নগরবাসীর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়। নতুন জবাইখানায় পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত জবাই, মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণ, শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ও বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধা রাখার বিষয়ে অবকাঠামোগত, কারিগরি ও পরিবেশগত দিক পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিতভাবে পশু জবাইয়ের ঝুঁকি কমাতে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই অবকাঠামো প্রয়োজন। এ ধরনের জবাইখানায় পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা থেকে শুরু করে মাংস সংরক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।’
তবে ডিএসসিসির বিদ্যমান দুটি জবাইখানার বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০১৯ সালে উদ্বোধনের দিন মাত্র একটি গরু জবাইয়ের পর হাজারীবাগের স্থাপনাটিতে দীর্ঘদিন কার্যক্রম দেখা যায়নি। গত ৩১ আগস্ট ডিএসসিসির প্রশাসক ড. আব্দুস সালাম সেখানে পশু জবাই কার্যক্রম পুনরায় চালু করেন। বর্তমানে মাঝেমধ্যে দিনে চার-পাঁচটি গরু জবাই করা হচ্ছে। জবাইখানার নিরাপত্তাকর্মী শাহ আলম জানান, চতুর্থ তলায় গরু রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখান থেকে নিচে এনে জবাইয়ের পর কসাইরা পশু চার ভাগ করে মাংস নিয়ে যান। তবে দ্বিতীয় তলায় থাকা উন্নত যন্ত্রপাতি বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
অন্যদিকে কাপ্তানবাজারের জবাইখানাটি নির্মাণের পর থেকেই বন্ধ। এর প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় ভেতরের অবস্থা দেখা যায় না। স্থাপনাটির সামনে গড়ে উঠেছে লেগুনার স্ট্যান্ড। পশু জবাইয়ের জন্য নির্মিত ভবনটি অব্যবহৃত পড়ে থাকলেও এর সামনের জায়গা ব্যবহার হচ্ছে যানবাহন রাখার কাজে।
এদিকে রাজধানীর মাংসের চাহিদা পূরণে পশু জবাই হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। মাংস ব্যবসায়ীরা গভীর রাতে বা ভোরে রাস্তার পাশে, বাজারে কিংবা নিজেদের দোকানের সামনে পশু জবাই করেন। এসব ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে পশু অসুস্থ বা রোগাক্রান্ত কিনা, তা পরীক্ষার নিয়মিত ব্যবস্থা থাকে না।
নগর বিশেষজ্ঞ আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘মাংস ব্যবসায়ীদের জোর করে আধুনিক জবাইখানায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষণ না খোলা জায়গায় পশু জবাই বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ ও আইনি বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে পুরো ঢাকার চাহিদা মেটাতে এক-দুটি বড় কেন্দ্রের পরিবর্তে এলাকাভিত্তিক ছোট ও মাঝারি আকারের আধুনিক জবাইখানা গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
মাংস ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দোকান বা ক্রেতার কাছাকাছি স্থানে পশু জবাই করে আসছেন। আধুনিক জবাইখানায় পশু নেয়ার বাড়তি খরচও তাদের অনাগ্রহের একটি কারণ। এ অভ্যাস পরিবর্তনে নির্ধারিত স্থানে জবাই নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সহজ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাতিসংঘের ২০২৫ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকায় জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর মাংসের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক গরু ও ছাগল জবাই করতে হয়। অথচ হাজারীবাগ ও কাপ্তানবাজারের জবাইখানা দুটি কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। পাশাপাশি শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মাংস পরিবহন সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। যানজট এবং সরু সড়কের কারণে এ পরিবহন আরো কঠিন হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় নতুন জবাইখানা নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান স্থাপনাগুলো সচল করা, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। ঢাকার বিভিন্ন অঞ্চলে চাহিদা বিবেচনায় ছোট ও মাঝারি আকারের আধুনিক জবাইখানা স্থাপন করলে পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানো সম্ভব হবে। তবে এসব স্থাপনা কার্যকর রাখতে খোলা জায়গায় জবাই বন্ধে আইন প্রয়োগ এবং ব্যবসায়ীদের নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে চাননি।










