দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো কেবল সংসদ ভবন, সচিবালয়, রাজনৈতিক কার্যালয় কিংবা বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর বাইরে রাজধানীতে গড়ে উঠেছে এমন কিছু অভিজাত সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ, সম্পর্কের বিস্তার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ পরিসর। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, উচ্চপদস্থ আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, ব্যাংকার ও করপোরেট নেতৃত্বের নিয়মিত উপস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠান একেকটি প্রভাবশালী সামাজিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।

ঢাকা ক্লাব লিমিটেড, গুলশান ক্লাব, বনানী ক্লাব, রাওয়া ও ক্যাডেট কলেজ ক্লাব—রাজধানীর অভিজাত এ পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই বিস্তৃত হয়েছে এমন যোগাযোগের বলয়। এসব ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রয়েছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও। ফলে সামাজিক যোগাযোগ ও বিনোদনের পরিসর ছাড়িয়ে ক্লাবগুলো যেন এখন ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অলিন্দ।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, দেশের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের চুক্তি নিয়ে আলোচনা, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ, মন্ত্রী-এমপিদের সাক্ষাৎ কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত তদবিরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও দেনদরবার হয় এসব ক্লাবে। আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে ব্যক্তিগত আতিথেয়তা ও সামাজিক সম্পর্কের সূত্র ধরে গড়ে ওঠা এসব যোগাযোগের বলয় অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ক্লাব কর্তৃপক্ষগুলোর দাবি, তাদের কার্যক্রম মূলত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংশ্লিষ্টতা নেই।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা ক্লাবের রয়েছে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য, গুলশান ও বনানী ক্লাব নাগরিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর সামাজিক সম্পৃক্ততার পরিসর তৈরি করেছে। ডিফেন্স অফিসার্স রিটায়ার্ড অ্যাসোসিয়েশন বা রাওয়া মূলত অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন, যার কার্যক্রমে ক্লাব সুবিধাও যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে ক্যাডেট কলেজ ক্লাবের ভিত্তি দেশের বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা, যেখানে সদস্য হিসেবে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ও বর্তমান সামরিক কর্মকর্তারাও। প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও সদস্যদের পরিচয়ে ভিন্নতা থাকলেও ক্লাবগুলোর রয়েছে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। খেলাধুলা, নৈশভোজ, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও অবসর বিনোদনের পাশাপাশি এখানে তৈরি হয় বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রভাবশালী মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ। তবে সময়ের সঙ্গে এসেছে পরিবর্তন। একসময় ব্যবসায়ী, আমলা, রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের নিয়মিত আড্ডায় ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হতো। সে চর্চা এখন অনেকটাই কমেছে বলে মনে করেন পুরনো সদস্যদের কেউ কেউ। সদস্যদের অনিয়মিত উপস্থিতি, সামাজিক সম্পৃক্ততা কমে যাওয়া এবং ক্লাব সংস্কৃতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তনের কারণে পুরনো সে ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে পুরনো সদস্যদের বড় অংশই এখন আর আগের মতো ক্লাবমুখী হন না।

এক শতাব্দীরও বেশি পুরনো ঢাকা ক্লাবে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। খেলাধুলা, সাঁতার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংগীত সন্ধ্যা, ভোজসভা ও পারিবারিক আয়োজনের পাশাপাশি অতিথি আপ্যায়ন ও আবাসনসেবাও রয়েছে এর কার্যক্রমে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজধানীর অন্য বড় ক্লাবগুলোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকা ক্লাব অনুসরণীয় হয়ে উঠেছে।

ঢাকা ক্লাব লিমিটেডের সদ্য সাবেক সভাপতি শামীম হুসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজধানীতে যত ক্লাব রয়েছে, তাদের সবাই ঢাকা ক্লাবকে অনুসরণ করে।’ ক্লাবের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ রাষ্ট্রীয় বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা রাখার সুযোগ পান কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কার কী ভূমিকা সেটা আমি জানি না, কাজেই সেটা বলতে পারব না। ক্লাবের কর্মকাণ্ড নন-পলিটিক্যাল।’

ঢাকার নতুন আবাসিক এলাকার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত ক্লাব সংস্কৃতির ধারায় প্রতিষ্ঠা পায় গুলশান ক্লাব লিমিটেড। ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করা ক্লাবটির প্রাথমিক কার্যক্রম ছিল সদস্যদের একে অন্যের বাসায় সমবেত হওয়ার মধ্য দিয়ে। পরে গড়ে ওঠে স্কোয়াশ কোর্ট, টেনিস কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার বিঘা জায়গাজুড়ে রয়েছে ক্লাবটির দুটি ভবন ও নানা সুযোগ-সুবিধা।

গুলশান ক্লাবে বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ২ হাজারের বেশি। ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যাংকার, আমলা, শিক্ষাবিদ, শিল্পী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এর সদস্য। পারিবারিক সম্পৃক্ততা দিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে এর কার্যক্রমে ব্যবসায়িক ও পেশাগত যোগাযোগের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে।

জানতে চাইলে ক্লাবের প্রেসিডেন্ট এমএ কাদের (অনু) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুলশান ক্লাব নন-পলিটিক্যাল একটি ক্লাব। রাষ্ট্র পরিচালনা বা স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে আমাদের ক্লাবের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরাও এ ক্লাবের সদস্য। তাদের কেউ কেউ ভোটিং মেম্বার। এছাড়া অনারারি ও করপোরেটসহ বিভিন্ন ধরনের সদস্য রয়েছেন। সদস্যদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও তারা ক্লাবে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নন।’

অন্যদিকে বনানী ক্লাবের যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। পারিবারিক সম্পৃক্ততা, অবসর বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটি নিজেদের একটি অলাভজনক পারিবারিক বিনোদন ও ক্রীড়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে সদস্যদের মতে, এর গুরুত্ব কেবল বিনোদন ও খেলাধুলায় সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের পরিচিতি, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে এখানে গড়ে উঠছে বিস্তৃত সামাজিক যোগাযোগের পরিসর।

অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ ও পারস্পরিক যোগাযোগের লক্ষ্যে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাওয়া। রাজধানীর মহাখালীর ভিআইপি রোডে প্রায় চার বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে সংগঠনটির নিজস্ব কমপ্লেক্স। এ কমপ্লেক্সেই পরিচালিত হচ্ছে রাওয়া ক্লাব। রেস্তোরাঁ, বেকারি, বেভারেজ রুম, লাইব্রেরি, কার্ড রুম, বিলিয়ার্ড রুম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশাপাশি রয়েছে জিমনেশিয়াম, সুইমিংপুল, টেবিল টেনিস, সাউনা ও স্টিম বাথের ব্যবস্থা। সদস্যদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যরাও নির্ধারিত নিয়মে এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন।

রাওয়ার সেক্রেটারি জেনারেল লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. ইরশাদ সাঈদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাস্তবে রাওয়া কোনো ক্লাব নয়, এটি একটি অ্যাসোসিয়েশন। অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে ক্লাবের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তবে তা সংগঠনটির কার্যক্রমের একটি ছোট অংশ মাত্র। ঢাকা ক্লাব কিংবা গুলশান ক্লাবের সঙ্গে রাওয়ার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। অন্য ক্লাবগুলোর মূল পরিচয় ক্লাবকেন্দ্রিক হলেও অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে রাওয়ার কার্যক্রমের পরিধি আরো বিস্তৃত।’

সংগঠনের কার্যক্রম শুধু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের অনেক অবদান রয়েছে। সেমিনারসহ নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। তবে রাওয়াকে অন্য ক্লাবের সঙ্গে এক করে দেখা বা এক কথায় ক্লাব হিসেবে পরিচয় করানো ঠিক হবে না।’

অন্যদিকে ক্যাডেট কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২০০৩ সালের এপ্রিলে রাজধানীতে যাত্রা শুরু করে ক্যাডেট কলেজ ক্লাব লিমিটেড। শুরুতে গুলশানের একটি বাসায় কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান পূর্বাচল নিউ টাউন প্রকল্পে। ক্লাবটির সদস্য সংখ্যা ৪ হাজার ৫৫০। সামরিক বাহিনী, প্রশাসন, ব্যবসা, ব্যাংকিং, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিক্ষাসহ বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত সাবেক ক্যাডেটরা এর সদস্য। তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ, পুনর্মিলনী, পারিবারিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন ক্লাবটির কার্যক্রমের অংশ। পূর্বাচলের নিজস্ব প্রাঙ্গণে সুইমিংপুল, লাইব্রেরি, খাবার ও অনুষ্ঠান আয়োজনের সুবিধাসহ বিভিন্ন সেবা রয়েছে।

গুলশান, ঢাকা ও উত্তরা—তিন ক্লাবেরই সদস্য ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী। ২০০০ সালে গুলশান ক্লাবের সদস্য হওয়ার পর বন্ধুদের নিয়ে অন্তত মাসে একবার ক্লাবে আড্ডা দিতেন এ শিল্পোদ্যোক্তা। বিদেশী ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে এলে তাদেরও ক্লাবে নিয়ে যেতেন। কিন্তু ব্যবসায়িক ব্যস্ততা এবং বন্ধুদের অনিয়মিত উপস্থিতির কারণে এখন আর কোনো ক্লাবেই যাওয়া হয় না তার।

অভিজাত ক্লাবগুলোর বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে আজম জে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গুলশান, বনানী ও ঢাকা ক্লাব একসময় অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস ক্লাব ছিল। এসব ক্লাবে সোস্যাল ইন্টারঅ্যাকশন, এনগেজমেন্ট ছিল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী, সরকারি আমলা, সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, এমনকি হাইকোর্টের বিচারপতিদেরও আনাগোনা থাকত। সেখানে ব্যবসায়িক আলোচনা, সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রের নীতিগত বিষয় ও সামাজিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হতো। এখন এগুলো আর খুব বেশি দেখা যায় না।’

ক্লাব সংস্কৃতিতে প্রজন্মগত পরিবর্তন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততা কমে যাওয়াকেও তিনি এ পরিস্থিতির কারণ বলে মনে করেন। আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘ক্লাব বলতে যে ধারণাটা আগে ছিল, এখনকার প্রজম্মের মধ্যে সেই ধারণাটাই ভিন্ন। সময়ের ব্যবধানে ক্লাবগুলোতে সামাজিক এনগেজমেন্ট আগের তুলনায় কমে গেছে, আচরণগত পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে কিছু দুর্ঘটনাও ঘটছে। এসব বিষয় অনেকে এড়িয়ে যেতে চান। যে কারণে পুরনো বিজনেস কমিউনিটির বড় অংশ এখন ক্লাবমুখী হন না।’