কর্মসংস্থান, উন্নত জীবনযাপন ও নাগরিক সুবিধার আশায় প্রতিদিনই শহরমুখী হচ্ছে মানুষ। বাড়ছে নগরের পরিধি, গড়ে উঠছে নতুন আবাসিক এলাকা, বহুতল ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। কিন্তু নগরায়ণের এ বিস্তারের মধ্যেও দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে শহরে একটি স্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বাড়ি ভাড়া, জমি ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়ের সঙ্গে আবাসন ব্যয়ের অসামঞ্জস্য এ সংকটকে আরো তীব্র করছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় তিন কোটি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাত কোটিতে। দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন সরবরাহ বাড়েনি। ফলে একদিকে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত বসতি, অন্যদিকে শহরের কেন্দ্র ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক এলাকাগুলোয় বাড়ছে আবাসনের ব্যয়। পর্যাপ্ত বাসস্থানের অভাবে অনেক পরিবারকে অস্বাস্থ্যকর ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আবাসন ঘাটতি বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট। ২০৩০ সাল নাগাদ তা বেড়ে ১ কোটি ৫ লাখ ইউনিটে দাঁড়াতে পারে। এ চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই সাশ্রয়ী আবাসনের। অথচ বছরে নির্মিত হচ্ছে মাত্র ৩১ হাজার ৫০০ ইউনিট, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। এ ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে আগামী দিনগুলোয় আবাসন সংকট আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্যেও নগরাঞ্চলের আবাসন সমস্যার চিত্র উঠে এসেছে। ওই শুমারি অনুযায়ী, দেশে বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৩৬ হাজার। বস্তি ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বড় অংশকে মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। তবে বস্তিবাসীর সংখ্যা দিয়ে দেশের সামগ্রিক আবাসন সংকটের ব্যাপ্তি পুরোপুরি বোঝা যায় না। অপর্যাপ্ত আবাসন, অনিরাপদ ভূমি অধিকার ও অসহনীয় বাড়ি ভাড়ার কারণে বস্তির বাইরে থাকা বহু পরিবারও আবাসন অনিশ্চয়তায় রয়েছে।
ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় এ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। কর্মসংস্থান ও সেবাপ্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীভবনের কারণে মানুষকে শহরমুখী হতে হচ্ছে। কিন্তু কর্মস্থলের কাছাকাছি আবাসন অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের নাগালের বাইরে। ফলে তাদের অনেককে শহরের প্রান্তে কিংবা অপরিকল্পিত বসতিতে থাকতে হচ্ছে। এতে কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি পানি, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ চলাচলের মতো মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
আবাসন সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা অনেক বসতি জলাবদ্ধতা, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, সবুজ পরিসর ও কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আবাসন সমস্যাকে কেবল ঘর নির্মাণের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার সম্পর্ক রয়েছে।
এ বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নগর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নগর পুনরুজ্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। জাতিসংঘের মানববসতি কর্মসূচি (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) ঘোষিত এ প্রতিপাদ্যে পুরনো ও অবক্ষয়গ্রস্ত নগর এলাকার উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং নগর উন্নয়নের সুফল সব শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘আবাসন কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়। বৈষম্য মোকাবেলা ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার অন্যতম ভিত্তি এটি।’
বাংলাদেশের জন্য নগর পুনরুজ্জীবনের ধারণাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নতুন নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদ্যমান নগরাঞ্চলের অব্যবহৃত জমি ও পুরনো আবাসিক এলাকার পরিকল্পিত ব্যবহার, গণপরিবহন ও নাগরিক সেবার উন্নয়ন এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে বস্তি উচ্ছেদকে একমাত্র সমাধান হিসেবে না দেখে বসতির পরিবেশ উন্নয়ন, নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন নিশ্চিত করা এবং বাসিন্দাদের ভূমি ও আবাসনের নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আবাসন সংকট মোকাবেলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ ও অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। তবে শুধু নতুন আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করলেই চলবে না; সেগুলো প্রকৃতপক্ষে যাদের প্রয়োজন, তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে হবে। এজন্য সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়ন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব নগর দিবসের বার্তা তাই কেবল নগরের অবকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়। নগরায়ণের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেয়া এবং প্রত্যেক মানুষের জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করাই টেকসই নগর উন্নয়নের মূল শর্ত।










