একটি শহর কতটা আধুনিক, তা কি তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক কিংবা ঝলমলে বিপণিবিতান দিয়ে বিচার করা যায়? নাকি শহরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে সেখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন কতটা সহজ, সুস্থ, নিরাপদ ও আনন্দময় তার ওপর? আমার কাছে দ্বিতীয় প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নগরায়ণের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ভবন নির্মাণ নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন।
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব নগর দিবস। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে শুরু হওয়া এ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নগরায়ণ যেমন অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি, তেমনি অপরিকল্পিত নগরায়ণ হয়ে উঠতে পারে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। এবারের প্রতিপাদ্য ‘Regenerating the City: Adequate Housing for All’—অর্থাৎ নগরের পুনরুজ্জীবন ও সবার জন্য উপযুক্ত আবাসন। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ ভাবনা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশ এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল নগরায়ণের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ নগর এলাকায় বসবাস করে; সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ। নগর জনসংখ্যা নির্ধারণের পদ্ধতি ভেদে পরিসংখ্যানে কিছু পার্থক্য থাকলেও প্রবণতাটি স্পষ্ট—শহরমুখী মানুষের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় মানুষ শহরে আসছে। কিন্তু এ জনস্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবাসন, গণপরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন কিংবা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ছে কি?
ঢাকার যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ ও উন্মুক্ত স্থানের সংকট আমাদের প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনার চেয়ে দ্রুত নগর সম্প্রসারণ কতটা ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই ভবিষ্যৎ নগরায়ণের প্রথম শর্ত সমন্বিত মহাপরিকল্পনা, যেখানে ভূমির ব্যবহার, আবাসন, কর্মসংস্থান, পরিবহন ও নাগরিক সেবাকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আবাসন থেকে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা
আজকের নগরবাসীর প্রয়োজন কেবল মাথার ওপর ছাদ নয়। পরিবারের গঠন বদলাচ্ছে, কর্মজীবনে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়ছে, প্রবীণদের প্রয়োজন ভিন্ন হচ্ছে, শিশুদের নিরাপদ বেড়ে ওঠার পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর কর্মজীবন ও দৈনন্দিন ব্যস্ততার মধ্যে শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তি, বিনোদন এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
একটি পরিবারের সদস্যদের যদি ব্যায়াম, শিশুর খেলাধুলা, সামাজিক অনুষ্ঠান, প্রার্থনা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটতে হয়, তাহলে তাদের মূল্যবান সময়ের বড় অংশ ব্যয় হয় যাতায়াতে। এ সময়ের অপচয় শুধু অর্থনৈতিক নয়; পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব রয়েছে।
এ উপলব্ধি থেকেই এবিসি রিয়েল এস্টেটের বৃহৎ আবাসন প্রকল্প ‘দ্য ওয়েসিস অ্যাট ইস্পাহানি কলোনি’ পরিকল্পনায় আমরা পাঁচটি মৌলিক জীবন চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছি—কনভেনিয়েন্স, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, বিনোদন ও সংস্কৃতি, সামাজিক মেলবন্ধন এবং আধ্যাত্মিক চর্চা।
মগবাজারে ৪৫৭টি অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে গড়ে ওঠা এ আবাসিক কমিউনিটিতে এসব প্রয়োজন পূরণের উপযোগী অভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল, বাসিন্দাদের প্রতিদিনের জীবনকে আরো স্বাচ্ছন্দ্যময় করা এবং অপ্রয়োজনীয় যাতায়াতের নির্ভরতা কমানো। বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতায় এ উদ্যোগের সুফল আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। একই ধরনের আর্থসামাজিক অবস্থানের অন্য নগরবাসীর তুলনায় তাদের দৈনন্দিন জীবন অনেক বেশি সুবিধাজনক ও সময়সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশীদের মধ্যে পরিচয়, সামাজিক বন্ধন ও সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের পরিসর বেড়েছে। এটি আমাদের কাছে শুধু একটি সফল আবাসন প্রকল্প নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ নগরজীবনের একটি কার্যকর মডেল।
বাংলাদেশের জন্য উপযোগী টেকসই নগর
টেকসই নগরায়ণ বলতে আমরা প্রায়ই বিদেশের অত্যাধুনিক সবুজ ভবন কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট সিটির ছবি কল্পনা করি। অথচ বাংলাদেশের জলবায়ু, সংস্কৃতি, নির্মাণসামগ্রী, জনঘনত্ব ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ নিজস্ব। আমাদের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে প্রশস্ত বারান্দা, ছায়াঘেরা উঠান, বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, জলাধার ও বৃক্ষরাজির যে ব্যবহার ছিল, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিবেশগত অভিজ্ঞতা। এ স্থানীয় জ্ঞানকে আধুনিক স্থাপত্য, সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পানি পুনর্ব্যবহার, শক্তিসাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং স্মার্ট বিল্ডিং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
ঢাকার জন্য যে সমাধান কার্যকর, উপকূলীয় চট্টগ্রাম কিংবা নদীবেষ্টিত বরিশালের জন্য তা অপরিবর্তিতভাবে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। কোথাও জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টি প্রধান চ্যালেঞ্জ, কোথাও লবণাক্ততা, কোথাও তাপমাত্রা বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি। ফলে ভবিষ্যতের সব শহর দেখতে একই রকম হওয়া প্রয়োজন নেই। বরং স্থানীয় প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রয়োজনের মধ্যেই প্রতিটি শহরের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে উঠবে।
ছোট প্লটের সীমাবদ্ধতা, সমন্বিত
আবাসনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও ভূমি সংকটপূর্ণ দেশে ছোট ছোট প্লটে বিচ্ছিন্নভাবে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রচলিত ধারা পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। একটি ছোট জমিতে নির্মিত ভবনের পক্ষে পর্যাপ্ত সবুজ স্থান, হাঁটার পথ, শিশুদের খেলার মাঠ, শরীরচর্চা, কমিউনিটি সুবিধা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা করা অনেক ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক ও কারিগরিভাবে কঠিন।
বিপরীতে বৃহৎ পরিসরে সমন্বিত আবাসন প্রকল্পে জমির ব্যবহারকে অধিকতর কার্যকর করা সম্ভব। অভিন্ন অবকাঠামো, উন্মুক্ত স্থান, সামাজিক সুবিধা ও আধুনিক ইউটিলিটি ব্যবস্থাপনার ব্যয় অনেক পরিবারের মধ্যে ভাগ করা যায়। পরিকল্পিত ঘনত্বের মাধ্যমে বাসিন্দাদের জন্য বেশি ব্যবহারযোগ্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
এ অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় এবিসি রিয়েল এস্টেট বর্তমানে মগবাজার, মিরপুর ও নারায়ণগঞ্জে চারটি বৃহৎ আবাসন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। প্রতিটি প্রকল্পে আমরা আরো দক্ষ ভূমি ব্যবহার, কার্যকর কমন ফ্যাসিলিটি, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা ও বাংলাদেশের পরিবারের বাস্তব জীবনচাহিদাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমাদের বিশ্বাস, আগামী দিনের আবাসন হতে হবে শুধু সুন্দর নয়, ব্যবহারিক; শুধু আধুনিক নয়, স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ঢাকার উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষাকৃত ব্যক্তিগত ও স্বতন্ত্র আবাসনের প্রতি বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। অনেকেই নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রাইভেসির জন্য প্রিমিয়াম মূল্যে ছোট পরিসরের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট বেছে নেন, যেখানে সুযোগ-সুবিধা বলতে হয়তো একটি রুফটপ সুইমিং পুল, জিম কিংবা লাউঞ্জ। অথচ একই পরিমাণ বিনিয়োগে একটি সুপরিকল্পিত বিলাসবহুল কন্ডোমিনিয়াম দিতে পারে আরো অনেক বেশি। এ পরিবর্তিত চাহিদাকে সামনে রেখে আমরা মগবাজারে নির্মাণ করছি ‘দি অর্চার্ড অ্যাট ইস্পাহানি কলোনি’, যা ঢাকা দক্ষিণের সবচেয়ে বিলাসবহুল কন্ডোমিনিয়াম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত। ১৪৩টি পরিবারের জন্য আন্তর্জাতিক মানের আবাসিক পরিবেশে থাকছে স্বাস্থ্য, বিনোদন, সামাজিকতা ও দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্যের ২০টিরও বেশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। প্রকল্পটির প্রতি ক্রেতাদের পজিটিভ সাড়া ও দ্রুত বিক্রি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—আধুনিক অভিজাত শ্রেণীও ক্রমে উপলব্ধি করছে, প্রকৃত বিলাসিতা কেবল একটি সুন্দর অ্যাপার্টমেন্টে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা নিহিত রয়েছে নিরাপদ, সুরক্ষিত, সুপরিচালিত ও সমৃদ্ধ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ আবাসিক কমিউনিটিতে।
তবে বৃহৎ প্রকল্প মানেই নির্বিচারে উঁচু ভবন বা অতিরিক্ত জনঘনত্ব নয়। যথাযথ অবকাঠামো, উন্মুক্ত স্থান, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো প্রকল্পই প্রকৃত অর্থে পরিকল্পিত হতে পারে না।
নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন: নগরের অপরিহার্য দায়িত্ব
ভবিষ্যৎ নগরায়ণের আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে—নিম্ন আয়ের মানুষের বাসস্থান।
একটি শহরের অর্থনীতি সচল রাখেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পরিবহনশ্রমিক, নিরাপত্তাকর্মী, গৃহকর্মী, নির্মাণশ্রমিকসহ অসংখ্য সেবাদানকারী মানুষ। অথচ তাদের অনেকেই অস্বাস্থ্যকর, ঘনবসতিপূর্ণ ও অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হন। তাদের জন্য সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সরকারকে পরিকল্পিতভাবে জমি বরাদ্দ, ভর্তুকিযুক্ত আবাসন, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন এবং কর্মস্থলের সঙ্গে সাশ্রয়ী গণপরিবহনের সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতও উপযুক্ত নীতিগত সহায়তায় এ উদ্যোগে অংশ নিতে পারে।
এখানে সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয়। ১৯৬০ সালে দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বস্তি বা অপরিকল্পিত বসতিতে বাস করতেন। সে বছর প্রতিষ্ঠিত হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড পরিকল্পিত গণআবাসন নির্মাণ শুরু করে। প্রথম তিন বছরেই ২১ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট নির্মিত হয়। বর্তমানে সিঙ্গাপুরের প্রায় ৮০ শতাংশ আবাসিক জনসংখ্যা এ সরকারি আবাসন ব্যবস্থায় বসবাস করে। এ পরিবর্তন কেবল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে আসেনি। দীর্ঘমেয়াদি ভূমিনীতি, গণপরিবহন, নাগরিক সেবা, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মতান্ত্রিক নগর ব্যবস্থাপনা ছিল এর ভিত্তি। তবে সিঙ্গাপুরের ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন নীতির বিতর্কিত দিকগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার উপযোগী, মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক মডেল।
নগরজীবনের সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে
নগরায়ণ একটি সামাজিক রূপান্তরও। গ্রামের তুলনায় শহরে যৌথ সম্পদ, অভিন্ন স্থান ও অবকাঠামোর ব্যবহার অনেক বেশি। তাই বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, লিফট ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার সঠিক ব্যবহার, পানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়, প্রতিবেশীর অধিকারকে সম্মান করা—এসব বিষয়ে নাগরিক সচেতনতা অপরিহার্য।
শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, আবাসিক সমিতি ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ। প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ, নাগরিক আচরণবিধি ও নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রমকে নগর ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিধিনিষেধের ন্যায্য ও ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
পুরনো শহরের পুনর্জাগরণ
এবারের বিশ্ব নগর দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমাদের পুরনো শহরগুলোর ভবিষ্যৎ কী?
পুরান ঢাকা, চট্টগ্রামের পুরনো বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা, কিংবা নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জনপদে অপরিকল্পিত ঘনত্ব, সরু রাস্তা, অপ্রতুল পয়োনিষ্কাশন ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু এসব এলাকার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক প্রাণশক্তি। নগর পুনরুজ্জীবন মানে পুরনো সবকিছু ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ নয়। প্রয়োজন ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, এলাকাভিত্তিক পুনর্বিন্যাস ও বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে পরিকল্পিত পুনর্গঠন। পুনর্নির্মাণের কারণে বিদ্যমান বাসিন্দা বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যেন উচ্ছেদ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
পাশাপাশি প্রতিটি শহরে পর্যাপ্ত পার্ক, জলাধার, বৃক্ষরাজি, হাঁটার পথ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ জরুরি। গণশৌচাগার, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, পাঠাগার, কমিউনিটি হল, শরীরচর্চা ও সাঁতারের সুবিধা, প্রার্থনাস্থল এবং সাশ্রয়ী ডিজিটাল সংযোগকে বিলাসিতা নয়, নাগরিক জীবনমানের প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
আগামী দিনের শহর, আগামী দিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগরায়ণের সাফল্য নির্ভর করবে আমরা আজ কী ধরনের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি তার ওপর। আরো কত বর্গফুট নির্মাণ করলাম, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কত মানুষের জীবনকে আরো সুস্থ, নিরাপদ, সহজ ও অর্থবহ করে তুলতে পারলাম। আমাদের প্রয়োজন পরিকল্পিত বৃহৎ আবাসিক কমিউনিটি, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য মর্যাদাপূর্ণ আবাসন, জলবায়ু-উপযোগী স্থাপত্য, কার্যকর গণপরিবহন, নাগরিক শৃঙ্খলা ও প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান। সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ, আবাসন উদ্যোক্তা ও নাগরিক সমাজকে এ লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ভবিষ্যতের শহর শুধু মানুষের থাকার জায়গা হবে না; হবে মানুষের ভালোভাবে বেঁচে থাকার পরিসর। এমন শহরই আমাদের নির্মাণ করতে হবে, যেখানে উন্নয়নের পরিমাপ হবে শুধু ভবনের উচ্চতায় নয়, মানুষের জীবনের উৎকর্ষে।










