ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ, অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ছিলেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি। তার আগ্রহ ও কাজের কেন্দ্রে রয়েছে বায়োক্লাইমেটিক আরবান ডিজাইন, টেকসই শহর ও সবুজ স্থাপত্য। বিশ্ব নগর দিবস উপলক্ষে দেশের নগরগুলোর সংকট ও সম্ভাবনা, নগরায়ণের গতিপ্রকৃতি, টেকসই ও সবুজ নগর গড়ার ক্ষেত্রে নীতিগত ব্যর্থতা ও করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবরিনা স্বর্ণা

বাংলাদেশের বড় শহরগুলোয় দীর্ঘদিন ধরেই দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। জনসংখ্যা বাড়ছে, অবকাঠামো সম্প্রসারণ হচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়ছে। সব মিলিয়ে শহরগুলোয় বর্তমানে সবচেয়ে বড় সংকট কী এবং নগরায়ণের গতিপ্রকৃতি কেমন দেখছেন?

আমাদের শহরগুলোয় মূলত জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ছে, ভবন নির্মাণ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ হচ্ছে। কিন্তু শহরগুলোর ধারণক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় শহরের ওপর ক্রমাগত চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে বিষয়টিকে একটু বিস্তৃত পরিসরে দেখা প্রয়োজন। এ সমস্যাগুলো অনেকাংশেই শহরের বাইরের সমস্যা। এর সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক দিকও জড়িত। বিষয়টি শুধু অবকাঠামো কিংবা নগর ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না।

ধরা যাক, জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ যদি শহরগুলোর উন্নয়নে ব্যয় করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এগুলো আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। শহরে যত বেশি অবকাঠামো নির্মাণ হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, তত বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অর্থাৎ আপনি শহরকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলছেন। ফলে আশপাশের গ্রাম ও জনপদ থেকে মানুষ কাজের সন্ধানে, উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় শহরে আসবে। কিন্তু এখানে মূল সমস্যা অভিবাসন নয়। সমস্যা হচ্ছে আমাদের নীতিনির্ধারণের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি।

আমরা যদি ঢাকার জনসংখ্যার চাপের কথা বলি, তাহলে প্রশ্ন করতে হবে, এত মানুষ ঢাকায় আসছে কেন? কারণ আমাদের অন্যান্য মফস্বল শহর এবং গ্রামীণ জনপদ ধীরে ধীরে বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে। একজন মানুষ নিজের এলাকায় বসবাস করেও কেন আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাজার ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা পাবে না? এ সুযোগ-সুবিধা কেন স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে উঠবে না?

অর্থাৎ আমরা একদিকে বলছি, শহরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শহরের বাইরের জনপদগুলোও বসবাসের উপযোগিতা হারাচ্ছে। সেই চাপ এসে পড়ছে শহরের ওপর। আমরা শুধু দৃশ্যমান সমস্যাটি নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু সমস্যার উৎস নিয়ে যথেষ্ট ভাবছি না।

শহরের ওপর চাপ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জলবায়ুর প্রভাব কতটা রয়েছে?

নগরায়ণের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিষয়টিও রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে। কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে। যে জমিতে ধান বা অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা সম্ভব ছিল, সেখানে লবণাক্ততার কারণে উৎপাদন কমছে। অনেকের ঘরবাড়ি নদীভাঙনে বিলীন হচ্ছে। এসব কারণেও মানুষ নিজের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এটিও নগরায়ণের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কারণ।

মূল কথা হলো, আমরা যদি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারি এবং শহরের যেসব সুবিধা মানুষকে আকর্ষণ করে, সেগুলো স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে শহরের ওপর চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কারণ ঢাকা শহরে থাকার মতো খুব বেশি ইতিবাচক বিষয় কি খুব বেশি আছে? বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, যানজটসহ নানা সমস্যা রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনমানের ক্ষেত্রেও নানা সংকট রয়েছে। তার পরও মানুষ বাধ্য হয়ে এখানে থাকছে, কারণ কাজের সুযোগ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা এখানেই বেশি।

নগরের চাপ হ্রাস ও এর বাইরের জনপদে বসবাসের উপযোগিতা কীভাবে বাড়ানো যেতে পারে?

আমরা যদি কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারি, তাহলে একদিকে বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে অন্যান্য জনপদও বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে একটি শহরের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি কী, সেখানে কোন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব, তা বিবেচনায় নিতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলা যায়। দেশে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে জমির ব্যবহার নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অস্ট্রেলিয়া বা স্পেনের মতো দেশ তাদের বিস্তীর্ণ অনুর্বর বা মরু অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে পারছে। আমাদের একই ধরনের সুযোগ খুবই সীমিত। কারণ আমাদের জমির জৈব ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আমাদের জ্বালানির চাহিদা যেমন রয়েছে, তেমনি কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমাদের প্রতিটি অঞ্চলের সম্ভাবনার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে এবং সেগুলোকে আরো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।

এ নিয়ে আমরা একটি চিন্তা করেছিলাম। আমাদের দেশে অনেক পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি রয়েছে। পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িগুলোকে কীভাবে নতুনভাবে ব্যবহার করা যায়। এগুলোর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব রয়েছে; জাদুঘর বা পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে সংরক্ষণ করলেই হবে না, এর সঙ্গে কার্যকর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যকারিতা যুক্ত করা সম্ভব। আমাদের পুরনো যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বুনন ছিল, যেখানে গ্রামের মানুষের সঙ্গে শহরের একটি নিবিড় সংযোগ ছিল, সেটি নতুনভাবে আবিষ্কার করা প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবে গ্রামই ছিল আমাদের অর্থনৈতিক শক্তির জায়গা। শহর সবসময় সেই শক্তির কেন্দ্র ছিল না।

বর্তমানে শহরকেন্দ্রিক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার কারণেও গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষ শহরে আসছে। কিন্তু আমরা চাইলে শিল্প-কারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ বিকেন্দ্রীকরণ করতে পারি। যেসব অঞ্চলে পর্যাপ্ত জনবসতি রয়েছে এবং শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা আছে, সেখানে পরিকল্পিতভাবে শিল্পায়ন করা যেতে পারে। এতে স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি হবে, গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে এবং ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও কার্যকারিতা বাড়বে।

এ ধরনের চিন্তাভাবনা মানবিক ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করতে হবে। একসময় জেলা বা অঞ্চলভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের কথাও আলোচনায় এসেছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ আমরা যদি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দিকে তাকাই, তাহলে দেখব হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের বড় অংশই শহরকেন্দ্রিক। আমরা শহরের উন্নয়ন ও বসবাসযোগ্যতা নিয়ে কথা বলছি, কিন্তু শহরের বাইরের জনপদগুলোর উন্নয়ন নিয়ে একই মাত্রায় চিন্তা করছি না। এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। অন্যথায় শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ বা জনঘনত্ব বৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না।

জন্মহার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে শহরের বাসযোগ্যতা রক্ষার সমাধান কী?

এর সমাধান হচ্ছে, বর্তমানে নগর পরিকল্পনায় যে ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটি হলো উচ্চ জনঘনত্ব উন্নত জীবনমান। অর্থাৎ জনসংখ্যার ঘনত্ব যেমন বেশি থাকবে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাত্রার মানও উন্নত করতে হবে।

জনসংখ্যার ঘনত্ব বলতে শহরে যানজট, ভিড়, ময়লা-আবর্জনা ও দূষণের কথা ভাবা হয়। কিন্তু এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অব্যবস্থাপনার ফল। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা, কার্যকর গণপরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত নগরসেবা নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ জনঘনত্বের মধ্যেও ভালো জীবনমান বজায় রাখা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়নে ঢাকা বারবার বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় উঠে আসছে। বায়ুদূষণ, যানজটসহ নানা কারণে শহরটির বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ঝুঁকির কথা জানা থাকলেও আমরা কীভাবে এমন একটি পর্যায়ে এসে পৌঁছলাম?

এখানে দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত, দেশের শহরের সমস্যাগুলো নিয়ে সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কিংবা দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদদের মধ্যে কারো কি নিজস্ব দায়বদ্ধতার বোধ তৈরি হচ্ছে? কেউ কি সমস্যাগুলোকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করছেন? সংবাদপত্রে খবর প্রকাশ হচ্ছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে না। অর্থাৎ কেউই যেন দায়িত্ব নিচ্ছেন না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা কমে যাবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের বুঝতে হবে এসব সমস্যার অধিকাংশই মানবসৃষ্ট এবং মানবসৃষ্ট সমস্যার সমাধানও মানুষের হাতেই রয়েছে। যেমন বায়ুদূষণের কথাই ধরুন। নির্মাণকাজ, ইটভাটা, ধুলাবালি—বিভিন্ন উৎস থেকে বায়ু দূষণ হচ্ছে। এক্ষেত্রে সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দেয়া যায়। সেখানে কোনো জায়গায় মাটি বা বালি উন্মুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখার সুযোগ নেই। হয় সেখানে পাকা আচ্ছাদন থাকতে হবে, নয়তো ঘাস বা অন্য কোনো সবুজ আচ্ছাদন থাকতে হবে। কারণ খোলা মাটির ক্ষয়সাধন, ধুলা উড়ে পরিবেশ দূষিত হয়। এতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, পাশাপাশি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়। অর্থাৎ এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে। ঢাকার নির্মাণকাজের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। কিন্তু বাস্তবে এসব নিয়ম মানা হচ্ছে না। কারণ নিয়ম থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।

আমাদের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগ করতে গেলে আন্দোলন বা প্রতিবাদের মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতৃত্বের মধ্যে কোনো বিষয়ে দৃঢ় সংকল্প থাকলে অনেক কঠিন সমস্যারও সমাধান সম্ভব। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েই এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা আমাদের শহরের দূষণ নিয়ে যেসব তথ্য প্রকাশ করে, সেগুলোও বুঝে দেখা প্রয়োজন। সারা বছর বায়ুদূষণের মাত্রা একরকম থাকে না। শীতকালে বৃষ্টি কমে যায়, বাতাসে ধুলাবালি বেড়ে যায়। ফলে এ সময় বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকে। অন্যদিকে বর্ষাকালে নিয়মিত বৃষ্টির কারণে বাতাসের ধুলাবালি অনেকটাই ধুয়ে যায়। তখন বায়ুর মান তুলনামূলক ভালো থাকে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ের দূষণমাত্রাই সামনে তুলে আনা হয়। বর্ষাকালে বায়ুর মান তুলনামূলক ভালো থাকলেও সেই ইতিবাচক চিত্র নিয়ে ততটা আলোচনা হয় না। আবার এসব দূষণ-সংক্রান্ত তথ্য ও প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্প ও অর্থায়নের উদ্যোগও তৈরি হয়। দূষণ নিয়ন্ত্রণের নামে কত লাখ কোটি টাকার প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে, সেগুলোও আমাদের পর্যালোচনা করা উচিত। এসব তথ্য সব সময় সরল কোনো বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারী সংস্থাগুলো কীভাবে আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছে, কীভাবে সেগুলোকে সামনে আনছে এবং পরবর্তী সময়ে কী ধরনের প্রকল্প প্রস্তাব করছে, সাথে ঋণ প্রস্তাব করছে তাও বোঝা প্রয়োজন।

আমাদের নিজেদেরও নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের শহরের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা প্রয়োজন। একটি শহরের শুধু নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরলে সেই শহরের সম্ভাবনা, সুযোগ ও অর্থনৈতিক শক্তির জায়গাগুলো আড়ালে থেকে যায়। পর্যটনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে শহরের ইতিবাচক ভাবমূর্তি সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঐতিহ্য, সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলোও তুলে ধরতে হবে।

শহরের সমস্যার সমাধান এবং শহরের ইতিবাচক সম্ভাবনা প্রকাশ—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসনের চাহিদাও বাড়ছে। বিশ্ব নগর দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত আবাসনকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমাদের আবাসন খাতের সংকটগুলো কীভাবে দেখছেন?

আমাদের আবাসন খাতের সংকটগুলোর অধিকাংশই মানবসৃষ্ট। ১৯৬০-এর দশকে তৈরি আবাসন মডেল এখনো অনুসরণ করলে সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে? প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক চাহিদা ও জীবনযাত্রাও বদলেছে। কিন্তু আবাসন খাতের পরিকল্পনাকারীরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের চিন্তাভাবনা বদলাচ্ছেন না।

ঝিলমিল, পূর্বাচল কিংবা উত্তরা তৃতীয় পর্বের মতো প্রকল্প মূলত ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস’ মডেলে তৈরি। অর্থাৎ সরকার জমি ও কিছু মৌলিক সুবিধা দেবে, এরপর বাড়ি নির্মাণের দায়িত্ব জমির মালিকের। কিন্তু ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এ মডেল কতটা কার্যকর? একজন সাধারণ মানুষ, তিনি বাড়ি নির্মাণের কারিগরি দিক, নির্মাণসামগ্রী সংগ্রহ কিংবা আর্থিক ব্যবস্থাপনা কতটা বুঝবেন? অল্প জায়গায় বেশি মানুষের জন্য মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করতে হলে বিশেষায়িত কারিগরি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

এক্ষেত্রে ‘ব্লকভিত্তিক’ সমন্বিত উন্নয়ন কার্যকর হতে পারে। বড় আকারের জমি নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নেইবারহুড বা পাড়াভিত্তিক উচ্চ ঘনত্বসম্পন্ন আবাসন নির্মাণ করা যেতে পারে। সরকার এককভাবে ব্যয় না করে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে পারে। তবে অতিরিক্ত মুনাফার কারণে আবাসনের মূল্য যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে লাগসই নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দেয়া যায়। জমির সংকট থাকা সত্ত্বেও দেশটি প্রত্যেককে আলাদা জমি দিয়ে বাড়ি নির্মাণের দায়িত্ব ছেড়ে দেয়নি, বরং সরকার জমি নিয়ে পরিকল্পিত আবাসন উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। বেসরকারি উন্নয়নকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নকশা, নির্মাণের মান, নান্দনিকতা ও আবাসিক ইউনিটের সংখ্যা বিবেচনা করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। উন্নয়নকারীদের জন্যও যুক্তিসংগত মুনাফার সুযোগ নিশ্চিত হয়। আমাদের দেশেও সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। এতে নাগরিক সুবিধা ও সেবাগুলো যৌথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও কমতে পারে।

শুধু পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করলেই হবে না, তা হতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত ও জলবায়ুবান্ধব। আমাদের জ্বালানির একটা বড় অংশ আমদানি করতে হয়, দেশীয় গ্যাসের মজুদও একসময় শেষ হবে। তাই কম জ্বালানি ব্যবহার করে পরিচালিত হতে পারে, এমন আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের জলবায়ু ও প্রাকৃতিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে ভবনের নকশা করতে হবে।

আবাসন পরিকল্পনায় শিশুদের বিকাশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আবাসিক এলাকায় খেলার জায়গা থাকতে হবে, যেখানে শিশুরা অভিভাবকদের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থেকেও স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে। বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, নিজের সিদ্ধান্ত নেয়া কিংবা মতবিরোধ মীমাংসার মধ্য দিয়ে শিশুর সামাজিক ও মানসিক বিকাশ ঘটে। কিন্তু আমাদের শিশুরা স্কুল ও বাসা—দুই জায়গাতেই অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। ফলে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়া ও সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে শেখার সুযোগ কমে যাচ্ছে।

একইভাবে বয়স্ক মানুষের প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। একটি আবাসন প্রকল্প শুধু কত বর্গফুটের ফ্ল্যাট তৈরি হলো, তার হিসাব নয়। বয়স্ক মানুষ সহজে বাড়ি থেকে বের হতে পারবেন কিনা, প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন কিনা, শিশুদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের সুযোগ থাকবে কিনা—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে আবাসন পরিকল্পনায় আমাদের মূল সীমাবদ্ধতা কি এখানে সামাজিক ও মানবিক বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না?

ঠিক তাই। আমরা আবাসনকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করিনি। শুধু ভবন বা স্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করেছি, সামাজিক মাত্রাটি বিবেচনায় নিইনি। প্রথমে একটি সামাজিক লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। এরপর তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থাপনা ও আবাসন নির্মাণ করতে হবে। মহাপরিকল্পনায় কী ধরনের গাছপালা থাকবে, ফল ও ফুলের গাছ, মৌমাছি ও পাখির বসবাসের সুযোগ থাকবে কিনা, সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। মানুষকে শুধু একটি ঘর দিয়ে দিলেই তার আবাসনের চাহিদা পূরণ হয় না। মানুষ কোনো গুদামঘরের পণ্য নয়, তার সামাজিক ও মানবিক চাহিদা রয়েছে।

আবাসনের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের চাকরি ও আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসনের বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। আমাদেরও শুধু বাড়ি নির্মাণ নয়, মানুষের কর্মসংস্থান ও আয়কে আবাসন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। ঝিলমিল প্রকল্পের কথাই ধরুন। সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও সেখানে প্রত্যাশিত আবাসন গড়ে ওঠেনি। অনেক জমি এখনো খালি পড়ে আছে। কারণ, শুধু প্লট বরাদ্দ দিলেই মানুষ সেখানে বসবাস করতে যাবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

আবাসনের চাহিদা শুধু স্থায়ী বসবাসের মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়। কেউ চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এসে মাসের পর মাস বাসা ভাড়া নেন, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা বা কোচিংয়ের জন্য আসেন। ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সাময়িক আবাসনের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে কারা কোথায় বসবাস করতে চান, কত দিনের জন্য থাকতে চান এবং তাদের কী ধরনের সেবা প্রয়োজন—এসব বিবেচনা পরিকল্পনায় আসতে পারে, বিশেষ করে যোগাযোগের সংযোগস্থলে বা (টি ও ডি) এলাকায়।

আরেকটি বিষয় হচ্ছে, আমরা প্রায় জনসংখ্যাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করি। অথচ আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বড় সম্পদ। তৈরি পোশাক খাত ও প্রবাসী আয়ের মাধ্যমে অর্থনীতি এগিয়ে নিতে এ জনশক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু আমরা তাদের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। প্রয়োজনীয় দক্ষতা না থাকায় অনেক তরুণ বিদেশে গিয়ে নিম্ন দক্ষতার ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। অন্যদিকে দক্ষতাভিত্তিক বিভিন্ন কাজে ফিলিপাইন, মিসর, পাকিস্তান ও ভারতের কর্মীরা সুযোগ পাচ্ছেন। আমাদের কর্মীদেরও দক্ষ করে তুলতে পারলে এসব সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব। তাই জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার চিন্তা করতে হবে।

আমাদের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, আমরা শুধু সমস্যা সমাধানেই বেশি মনোযোগী, মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও জীবনমানের উচ্চতর লক্ষ্য নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা করি না। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই হবে না, মানুষ কেমন জীবন চায়, সেটিও পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হতে হবে।

এ প্রসঙ্গে কানাডার অভিজ্ঞতার কথা বলা যায়। সেখানে বাসা ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় ‘ওয়াকেবিলিটি স্কোর’ বা হাঁটাচলার পরিবেশ কেমন সেটি যাচাই করা হয়। অর্থাৎ একটি বাড়ি থেকে হেঁটে কত দূরত্বের মধ্যে স্কুল, কলেজ, পার্ক, দোকানপাট, চিকিৎসা কেন্দ্র, বাসস্ট্যান্ড কিংবা মেট্রো স্টেশন পাওয়া যাচ্ছে, সেটি বিবেচনা করা হয়। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার ক্ষেত্রেও এ সূচক ব্যবহার করে দেখেছি, অনেক জায়গায় হাঁটার দূরত্বেই এসব সুবিধা রয়েছে। কিন্তু উপযুক্ত হাঁটার পথ ও অবকাঠামো না থাকায় মানুষ সেগুলো কাজে লাগাতে পারছে না। অর্থাৎ সুযোগ ও সুবিধা কাছাকাছি থাকলেও সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী পরিবেশ আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি।

আমাদের শহরগুলোকে হাঁটাচলার উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন?

আমি রাজশাহী নিয়ে একটি পরিকল্পনা করেছিলাম। একজন শিক্ষার্থীকে সঙ্গে নিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলাম, কীভাবে শহরটিকে হাঁটাচলার উপযোগী করা যায়। হাঁটার উপযোগী শহর বলতে শুধু হাঁটার রাস্তা থাকাকে বোঝায় না; হেঁটে মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণের সুযোগও থাকতে হবে।

আমরা শহরের বিভিন্ন স্থানকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে কী কী নাগরিক সুবিধা রয়েছে, তা মানচিত্রে চিহ্নিত করেছি। কোথাও চিকিৎসা কেন্দ্র আছে, কিন্তু স্কুল নেই; কোথাও স্কুল আছে, কিন্তু বাসস্ট্যান্ড নেই। এসব সুবিধা ও ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে শহরটিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার প্রস্তাব তৈরি করেছিলাম। প্রকল্পটি বাস্তব তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে করা হয়েছিল।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একাডেমিক গবেষণা ও উদ্ভাবনী ধারণাকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে উদ্ভাবনের জন্য আলাদা বিভাগ থাকলেও বাস্তবে গবেষকদের কাছ থেকে ধারণা নেয়া বা সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে গবেষণার সুফল নীতিনির্ধারণে যুক্ত হচ্ছে না।

আবাসন খাতেও একই সমস্যা। এখনো ষাটের দশকের জমিনির্ভর ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস’ মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। যে দেশে জমির পরিমাণ সীমিত, সেখানে এত বছর ধরে এ মডেল অনুসরণ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। সরকার ও বেসরকারি উন্নয়নকারী—সবারই এর বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে।

আমাদের চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা এখনো এমন একটি মানসিকতায় আটকে আছি, যেখানে অন্যরা আমাদের জন্য সমাধান তৈরি করে দেবে বলে অপেক্ষা করি। অথচ নিজেদের সমাজ, অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্ভাবনী সমাধান নিজেদেরই তৈরি করতে হবে। হাতিরঝিল প্রকল্পের কথাই বলা যায়। এটি নিয়ে আমার একজন শিক্ষার্থীর গবেষণা ছিল, যা পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের নিজস্ব গবেষণা ও ধারণা থেকেও বড় প্রকল্পের জন্ম হতে পারে। প্রয়োজন সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া।

একটি শহরকে সবুজ ও বসবাসযোগ্য করে তুলতে হলে কোন বিষয়গুলোকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন? সরকার, নীতিনির্ধারক কিংবা বাস্তবায়নকারী সংস্থার ক্ষেত্রে কোন কাজগুলো নিশ্চিত করা জরুরি?

সবুজ ও বসবাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই বিদ্যমান সবুজ এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে, পাশাপাশি নতুন সবুজ এলাকা তৈরি করতে হবে। রমনা পার্কের মতো কিছু জায়গা ছাড়া ঢাকায় নতুন করে উল্লেখযোগ্য সবুজ এলাকা গড়ে তুলতে পারিনি। প্রয়োজনে সরকার জমি অধিগ্রহণ করে ভবন ভেঙেও সবুজ এলাকা তৈরি করতে পারে।

জলাভূমি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। জলাভূমি রক্ষার পরিবর্তে ভরাট করা হচ্ছে। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন প্রয়োজন। তা না হলে আমরা সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলব, আর অপরিকল্পিত উন্নয়ন চলতেই থাকবে।

আরেকটি বিষয় হলো, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথেষ্ট ভূমিকা নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও সিটি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান থাকলেও তাদের নেতৃত্ব ও কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজউকের কার্যক্রমের সঙ্গে স্থপতিসহ সমাজবিজ্ঞানী বা নগর-সমাজ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করা হলে আরো ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদদের কারিগরি দক্ষতা অবশ্যই প্রয়োজন, তবে শহর সম্পর্কে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শনও গুরুত্বপূর্ণ।

রাজউকের কাজ শুধু জমি তৈরি বা বিক্রি করা নয়, রাজউকের দায়িত্ব হওয়া উচিত ঢাকাকে নিয়ে সুস্পষ্ট রূপকল্প তৈরি করা, শহরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা এবং সেই অনুযায়ী উন্নয়ন পরিচালনা করা।

রাজউকের চেয়ারম্যান এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ঢাকার সব সমস্যার দায় রাজউকের নয়। যানজটের বিষয়টি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের, জলাবদ্ধতার বিষয়টি অন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্ব। অর্থাৎ নগরের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান যুক্ত। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ও দায়বদ্ধতা কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?

এসব সমস্যা সমাধানে একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষ বা একক ছাতা অর্গানাইজেশন প্রয়োজন। আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। এ কারণেই নগর সরকার বা আরবান গভর্ন্যান্সের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। একটি নগর সরকারের অধীনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থাকলে সমন্বয় সহজ হতো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব কমত।

আমাদের এখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে প্রকল্প হাতে নেয়। কোনো প্রকল্প আরেকটির সঙ্গে মিলে যায়, কোনোটি আবার সাংঘর্ষিক হয়। ফলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও একই কাজ বারবার করার কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়ে।

সমস্যাটি মানুষের স্বভাবগত ব্যর্থতা নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। ঢাকা মেগাসিটি থেকে আরো বড় নগর এলাকায় সম্প্রসারণ হচ্ছে। অথচ বলা হচ্ছে, শহরের ৬৬ শতাংশ এলাকা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ শহর কি কখনো পরিকল্পিত হবে না? একে কার্যকর ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনার উদ্যোগ কোথায়?

আমরা গবেষণা ও সরজমিনে কাজের মাধ্যমে বিভিন্ন সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু অনেক সময় নিজেদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতা কাজে না লাগিয়ে বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি কিংবা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সুপারিশের অপেক্ষা করি। অথচ নিজেদের গবেষণা থেকেও লাগসই সমাধান বের করা সম্ভব।

ঢাকার অপরিকল্পিত এলাকাগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আপনাদের গবেষণায় কী ধরনের সমাধানের প্রস্তাব ছিল?

এর একটি সমাধান হলো পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস বা পুনঃউন্নয়ন। একটি এলাকায় মানুষের বসবাস, কর্মসংস্থান, স্কুল, বাজারসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। সেখানকার মানুষকে অন্য এলাকায় সরিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না। তাদের বিদ্যমান পরিবেশ বিবেচনায় রেখেই উন্নয়ন করতে হবে।

ধরা যাক, একটি সরকারি জমিতে তিন হাজার মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাহলে আশপাশের এলাকার তিন হাজার মানুষকে সেখানে স্থানান্তর করে তাদের পুরনো জমিগুলো পরিকল্পিতভাবে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। এজন্য সরকার প্রথমে আবাসন নির্মাণে বিনিয়োগ করবে। বাসিন্দাদের নতুন আবাসনে স্থানান্তরের পর পুরনো এলাকাগুলো অ্যাপার্টমেন্ট ও আবাসন ব্লক হিসেবে উন্নয়ন করা যাবে। কারো পাঁচ কাঠা, কারো ১০ বা ১২ কাঠা জমি থাকতে পারে। জমির মূল্য বিবেচনায় নিয়ে নতুন উন্নয়ন করা সম্পত্তির অংশ তাদের বুঝিয়ে দেয়া হবে। এতে তাদের সম্পত্তির মূল্য বজায় থাকবে, আবার উন্নত ও নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের সুযোগও তৈরি হবে, আর শহর হতে থাকবে পরিকল্পিত।

অনেকের জমির আকৃতি এমন যে সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে ভবন নির্মাণ কঠিন। কিন্তু পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে জমিগুলো একত্র করে উন্নয়ন করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষকে পরিচিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। তাদের স্কুল, বাজার ও কর্মস্থল আশপাশেই রয়েছে। দূরের কোনো আবাসিক এলাকায় পাঠিয়ে দিলে এই সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাবে।

এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব। প্যারিসের মতো শহরেও একসময় বড় ধরনের পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। সিঙ্গাপুরেও পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য পুরনো শপ হাউজ ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অবশ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু স্থাপনা সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এসব কাজের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দৃঢ় অবস্থান ও কারিগরিভাবে যথাযথ পরিকল্পনা প্রয়োজন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অর্থের অভাবই প্রধান বাধা নয়। বিদেশী অর্থায়নও বিভিন্ন প্রকল্পে আসে। কিন্তু অর্থ কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থ ব্যয় করতে হবে।

এক্ষেত্রে সরকারের প্রতি আপনার নীতিগত সুপারিশ কী হবে?

প্রথম কথা হলো, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। মানুষের জন্য কোন বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, তা বুঝতে হলে নগরবাসীর কথা শুনতে হবে। একজন চিকিৎসক যেমন স্টেথোস্কোপ দিয়ে হৃদস্পন্দন শুনে রোগীর অবস্থা বোঝেন, নিতিনির্ধারকগনদের তেমনি মানুষের জীবনযাপনের বাস্তবতাগুলো বুঝতে হবে।

ঢাকায় বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের পরও মানুষের হাঁটার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়েছে। রাস্তা পার হতে গেলে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়। মেট্রোরেল থেকে নেমেও অনেক জায়গায় হাঁটার উপযুক্ত ব্যবস্থা পাওয়া যায় না। অথচ বিশ্বজুড়ে পথচারীবান্ধব নগরায়ণকে টেকসই শহর গড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। হাঁটার সুযোগ বাড়লে শারীরিক সুস্থতা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যগত ব্যয়ও কমানো সম্ভব।

অর্থাৎ মেট্রোরেল ও বাসে ওঠানামার স্থানের সঙ্গে হাঁটার পথের সমন্বয় করতে হবে। ফুটপাত, গাছ, বসার জায়গা, পানির ব্যবস্থা ও গণশৌচাগারের মতো ছোট উদ্যোগও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এজন্য সবসময় বড় প্রকল্প বা বিদেশী অর্থায়নের প্রয়োজন নেই। নগর পরিকল্পনায় গাড়ির পাশাপাশি পথচারীদেরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

রাজউকের নীতিমালায় ভবনের সামনে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা যেতে পারে। আবাসিক এলাকায় ভবনের মধ্যে দূরত্ব, সবুজ জায়গা ও মানুষের সামাজিক মেলামেশার সুযোগ থাকা জরুরি। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বছরের প্রায় পুরো সময়ই বাইরের পরিবেশ ব্যবহার করা সম্ভব। অথচ পরিকল্পনার অভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

সরকারকে নগর পরিকল্পনায় নতুন ধারণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে। শুধু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, সামাজিক, স্থাপত্য ও পরিকল্পনাগত উদ্ভাবনও জরুরি। এজন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিশেষ কোনো কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমস্যা চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠাবে। গবেষকরা সেসব সমস্যার সমাধান প্রস্তাব করবেন, আর সরকার তা যাচাই করে বাস্তবায়ন করবে। আমাদের এখানে সমস্যা নিয়ে আলোচনা অনেক হয়। কিন্তু গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নের মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি হয় না। ফলে সমস্যার বিবরণ দিতেই অনেক সময় শেষ হয়ে যায়, সমাধানের দিকে আর এগোনো হয় না। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।