চীন কি অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, নাকি স্থবির হয়ে পড়ছে? একদিকে দেশটির রফতানি খাত—বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেলসহ প্রায় সব ধরনের উৎপাদিত পণ্য—বিশ্বের ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) শিল্পেও চীনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পরই; ইউরোপ এক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। অন্যদিকে আমি আগেও বহুবার লিখেছি, চীন এখন জাপানের আদলে আবাসন খাতের গভীর সংকটের ষষ্ঠ বছরে প্রবেশ করেছে। তাহলে কি একই সঙ্গে চীনের অর্থনীতি দ্রুত এগিয়েও চলতে পারে, আবার স্থবিরও থাকতে পারে?
সম্প্রতি ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ইউয়ানচেন ইয়াং ও আমি বর্তমান চীনের সঙ্গে ১৯৯০-এর দশকের জাপানের বিস্ময়কর সাদৃশ্যগুলো তুলে ধরেছি। বিশেষ করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক রিয়েল এস্টেট এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো খাতের মিলগুলো আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। দুই দেশেই সম্পত্তির বাজারে ফাটকাবাজির উন্মত্ততা ভেঙে পড়ার পর নির্মিত অতিরিক্ত অবকাঠামো ও ভবনের বিশাল বোঝা তৈরি হয়েছে। এ বাড়তি নির্মাণের চাপ কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। চীন এখনো সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, চীন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের চেয়েও মাথাপিছু বেশি আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে, যদিও দেশটি এখনো ওই দুই দেশের তুলনায় অনেক দরিদ্র। দেশটির সড়ক ও রেলপথের নেটওয়ার্ক বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতিগুলোর সমপর্যায়ে পৌঁছেছে; অনেক ক্ষেত্রে এসব অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও উন্নত।
কিন্তু চীনের অর্থনীতি একই সঙ্গে গভীরভাবে ভারসাম্যহীন। বিষয়টিকে এমন একজন বডিবিল্ডারের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যিনি শুধু শরীরের ধড়ের পেশিই বাড়িয়েছেন। উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ভোগব্যয় চীনে এখনো দুর্বল। দেশটির পূর্বাঞ্চলে এমন কিছু বড় শহর রয়েছে, যেগুলো উন্নয়নের দিক থেকে পশ্চিমা বিশ্বের সমপর্যায়ের শহরগুলোর সঙ্গে পাল্লা দেয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছে। অথচ চীনের অন্তত অর্ধেক মানুষ যে ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে, সেখানকার জীবনযাত্রার মান লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবর্তী পর্যায়ে রয়ে গেছে।
এখন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, আবাসন খাতের বুদ্বুদ ফেটে যাওয়ার পর চীন হয়তো আর কখনই তথাকথিত মধ্যম আয়ের ফাঁদ থেকে বেরোতে পারবে না। জাপানে যখন রিয়েল এস্টেট সংকট দেখা দিয়েছিল, তখন দেশটি এরই মধ্যে অত্যন্ত সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠেছিল। মাথাপিছু আয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি। অথচ ৩০ বছর পর জাপানের মাথাপিছু আয় এখন ইতালির কাছাকাছি; আর ইতালির মাথাপিছু আয় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে দরিদ্র অঙ্গরাজ্য মিসিসিপির চেয়েও কম। অন্যদিকে বর্তমানে চীনের সমৃদ্ধির মাত্রা ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকের জাপানের তুলনায় অনেক নিচে।
স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চীনের সবচেয়ে গতিশীল খাতগুলোর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অংশও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। দেশটিতে তরুণদের বেকারত্ব পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এ-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতেও আবাসন ও অবকাঠামো খাতের ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়া ভূমিকার বিকল্প তৈরি করা কঠিন হবে। ইয়াং ও আমি দেখিয়েছি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ
প্রভাব মিলিয়ে চীনের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে এ দুই খাতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তবু চীনের রিয়েল এস্টেট সংকট দেশটির ভূরাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে অনিবার্যভাবে সীমিত করে দেবে—এমন ধারণা ভুল হবে। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বললে কিংবা প্রযুক্তিবিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিলে শোনা যাবে, চীনের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী ও উদ্ভাবনী হয়ে উঠেছে। চীন গণতান্ত্রিক দেশ নয়। ফলে দেশটির নেতারা অর্থনীতির অন্যান্য অংশকে কয়েক দশক ধরে অতিরিক্ত নির্মাণের বোঝা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দিয়েও প্রযুক্তি ও রফতানির গতিশীল খাতগুলোকে সমৃদ্ধ হতে দিতে পারেন। এমন একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা মোটেই অসম্ভব নয়, যেখানে ৪৫ কোটি চীনা মানুষ প্রযুক্তি ও উৎপাদন শিল্পনির্ভর গতিশীল অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ জীবনযাপন করছে, আর বাকি ৯৫ কোটি মানুষ অনেক নিম্নমানের জীবনযাত্রা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
এ ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হলে অধিকাংশ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশে সম্পদ পুনর্বণ্টনের দাবিতে প্রবল রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতো। ইউরোপের দেশগুলো এরই মধ্যে এ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চীনে পরিস্থিতি এমন নাও হতে পারে। বিশেষত, দেশটির সরকার যদি মনে করে যে জাতীয় নিরাপত্তা ও বিশ্বমঞ্চে চীনের অবস্থান সুদৃঢ় করতে হলে প্রযুক্তি ও শিল্পের অগ্রবর্তী খাতগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি, তাহলে বৈষম্য কমানোর চাপ উপেক্ষা করাও তাদের পক্ষে সম্ভব। তাছাড়া ৪৫ কোটি মানুষের জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনসংখ্যার প্রায় সমান।
অবশ্য এমন পরিণতি বাস্তবে সম্ভব হবে কিনা, তা এখনো দেখার বিষয়। ২০১৩ সালে শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছে। কিন্তু বড় অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোয় কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রবল আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত বৈষম্য হ্রাসের চাপকে ছাপিয়ে যেতে পারে।
ষাটের দশকের শেষ দিকে প্রখ্যাত অর্থনীতির ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন যুক্তি দিয়েছিলেন, পল স্যামুয়েলসনসহ অনেক অর্থনীতিবিদের ধারণার বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন কখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পুরোপুরি অর্থনৈতিক ব্যবধান ঘোচাতে পারবে না। তা সত্ত্বেও সমৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রযুক্তির অগ্রবর্তী পর্যায়ে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে এবং সামরিক সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চীনের একটি বড় পার্থক্য হলো বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত হতে চীন সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ সত্ত্বেও এটা স্পষ্ট যে জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি—বর্তমান বিশ্বের বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে এ দুই পরাশক্তির ব্যাপক সহযোগিতা প্রয়োজন।
অতএব চীনের রিয়েল এস্টেট সংকট যতই স্থবিরতা তৈরি করুক না কেন এবং অতিরিক্ত নির্মাণের বোঝা আগামী বহু বছর প্রবৃদ্ধিকে চেপে রাখার আশঙ্কা থাকলেও দেশটির অর্থনীতির গতিশীল কেন্দ্রটি সমৃদ্ধ হতে থাকবে। তবে এজন্য চীনকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে এবং সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিপজ্জনক প্রলোভনে পা দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট়]
কেনেথ রোগফ: সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ; অধ্যাপক, অর্থনীতি ও জননীতি বিভাগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়










