২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে সুসংবাদ। এতে উত্তরণের আগে প্রস্তুতি জোরদার করার এবং এলডিসি-সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বাণিজ্যসুবিধা ধরে রাখার জন্য বাড়তি সময় মিলেছে। তবে সময় বাড়লেই অর্থনীতির দুর্বলতা দূর হবে না। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে বাস্তব সংস্কারের মাধ্যমে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করে। এ অগ্রগতি তিনটি মানদণ্ডে দেখা হয়। এগুলো হলো: মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। কোনো দেশকে উত্তরণের জন্য বিবেচনা করতে হলে পরপর দুটি পর্যালোচনায় নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হয়। বাংলাদেশ ২০১৮ সালের পর্যালোচনায় প্রথমবার এবং ২০২১ সালের পর্যালোচনায় আবারও উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করে। এরপর সিডিপি বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশ করে।
কভিড-১৯ মহামারির কারণে অর্থনীতি ও উন্নয়নে সৃষ্ট ক্ষতি সামাল দিয়ে মসৃণভাবে উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশ, লাও পিডিআর ও নেপালকে ব্যতিক্রমীভাবে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দেয়া হয়। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত হয় ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। বর্তমান সিদ্ধান্তে সে প্রস্তুতিকাল বাংলাদেশ ও নেপালকে আরো তিন বছর বাড়ানো হয়েছে।
বাড়তি সময়ের তাৎপর্য হলো, বাংলাদেশ এখন প্রস্তুতির ঘাটতি পূরণ এবং উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে। প্রস্তুতিকালে এলডিসি মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা ও বাণিজ্যসুবিধা প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সব বাজারে সুবিধার ধরন বা মেয়াদ এক হবে না। তাই প্রধান বাণিজ্য-অংশীদারদের সঙ্গে আগেভাগে আলোচনা করে শুল্ক, উৎপত্তিবিধি ও উত্তরণ-পরবর্তী বাজারসুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিতে হবে।
এ সময়ে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক লেনদেনের চাপ সামলানো এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বিনিয়োগ ও উৎপাদনের জন্য জরুরি। করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি করব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও ন্যায্য করতে হবে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়মের জবাবদিহি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলাও জোরদার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানো দরকার। এজন্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, দক্ষ শ্রমিক তৈরি, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত পরিবহন নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার খরচ কমানো জরুরি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা দিলে তারা নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। শুধু বাণিজ্যচুক্তি করলেই হবে না; সে সুযোগ কাজে লাগানোর সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে।
জাতিসংঘের প্রস্তাবে কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য সংস্কার, মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়ন এবং অগ্রগতির নিয়মিত প্রতিবেদন দেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তাই প্রতিটি লক্ষ্যের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা, অর্থায়ন ও পরিমাপযোগ্য ফল নির্ধারণ করা উচিত। ২০২৯ সালকে সামনে রেখে এমন অর্থনীতি গড়াই হবে মূল লক্ষ্য, যা এলডিসি-সংশ্লিষ্ট সুবিধা কমে যাওয়ার পরও রফতানি প্রতিযোগিতা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে পারে।
ড. ফাহমিদা খাতুন, নিউইয়র্ক থেকে
অর্থনীতিবিদ ও সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি










