একসময় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে উন্নয়নের বিস্ময় হিসেবে দেখত বিশ্ব। হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ অভিধাকে ভুল প্রমাণ করে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে। টানা দুই দশক ধরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুতের আওতা সম্প্রসারণ, মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়া, গড় আয়ু বৃদ্ধির মতো অর্জন দেশটির সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সেই সাফল্যের গল্পের পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঘাটতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের সংকট গভীরে শিকড় গেড়েছিল। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ সেই দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে দুটি ভিন্ন গল্প তৈরি হয়েছে—একটি সম্ভাবনা ও অর্জনের, অন্যটি ভঙ্গুরতা ও জবাবদিহির অভাবের।

অতীতের অর্জনগুলোকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে প্রায় ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। করোনার অভিঘাতের মধ্যেও অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছিল। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ২২৭ ডলারে, যেখানে ভারতের ছিল ১ হাজার ৯৪৭ ডলার। অর্থাৎ এ সূচকে বাংলাদেশ ভারতকে ২৮০ ডলারে পেছনে ফেলেছিল। ২০২৬ সালের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রক্ষেপণেও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেশি দেখানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের গড় আয়ু বেড়ে ৭৪ বছরের ওপরে উঠেছিল এবং বিদ্যুতের আওতা প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছেছিল।

দারিদ্র্য হ্রাসেও অগ্রগতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৯১ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ, ২০২২ সালে তা ১৮ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ২০২১ সালের আগস্টে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এসব অর্জন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সম্ভাবনারই পরিচায়ক।

কিন্তু প্রবৃদ্ধির এ চিত্র অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো পুরোপুরি প্রকাশ করেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সেই সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে আসে প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বিভিন্ন প্রক্ষেপণেও অর্থনীতির গতি শ্লথ হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। তবে সংস্থাভেদে পূর্বাভাসের পার্থক্য রয়েছে এবং সেগুলোকে প্রকৃত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।

অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংকটগুলোর একটি ব্যাংক খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে অনুপাতটি ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের অনুপাত বিশ্বের সর্বোচ্চ হারগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পর বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ সংকট কেবল ঋণ আদায়ের ব্যর্থতা নয়, এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সুশাসন, ঋণ মূল্যায়ন ও তদারকির দীর্ঘদিনের দুর্বলতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ বিতরণ, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধা এবং খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল করার প্রবণতা এ সংকটকে গভীর করেছে। ২০২৪ সালের পর ঋণের শ্রেণীকরণ ও তথ্য প্রকাশে পরিবর্তনের ফলে আগে আড়ালে থাকা অনিয়মের বড় অংশ দৃশ্যমান হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যার একটি অংশ নতুন করে তৈরি হওয়ার পরিবর্তে পুরনো সমস্যার প্রকৃত ব্যাপ্তি সামনে এসেছে।

অন্যদিকে মুদ্রাবাজার ও বৈদেশিক খাতেও চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালের শুরুতে প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য প্রায় ৮৬ টাকা থাকলেও ২০২৪ সালের শেষ দিকে তা ১২০-১২২ টাকায় পৌঁছে। এ সময়ে টাকার উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়ন হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্টে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারে ওঠা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০২৪ সালের আগস্টে মোট হিসাবে প্রায় ২৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল প্রায় ২০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এখানে হিসাব পদ্ধতির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ; মোট রিজার্ভ ও বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভকে একই ভিত্তিতে তুলনা করা যায় না।

মূল্যস্ফীতির চাপও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করেছে। ২০২৪ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশের বেশি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও তা প্রায় ১০ শতাংশে অবস্থান করে। ২০২৫ সালেও মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে ছিল। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। এর সঙ্গে বিনিয়োগের স্থবিরতা যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ সংকুচিত করেছে।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে আসা, প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা এবং শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার ঘটনা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে নেমে আসে প্রায় ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৫ সালে নিট এফডিআই প্রবাহ বাড়লেও তার বড় অংশ এসেছে পুনর্বিনিয়োগকৃত মুনাফা ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে। নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের প্রবাহ তুলনামূলক সীমিত থাকায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা থেকেই যায়। একই সময়ে শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া ও শ্রমিকদের কর্মহীন হয়ে পড়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে ২০২২ সালের পর দারিদ্র্য আবার বেড়েছে, ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার আনুমানিক ২১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

প্রশ্ন হলো, উন্নয়নের মহাসড়ক থেকে অর্থনীতি এ অবস্থায় পৌঁছাল কেন?

প্রথমত, উন্নয়নের একটি বড় অংশ অবকাঠামো নির্মাণে দৃশ্যমান হলেও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমানভাবে শক্তিশালী করা হয়নি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল ও উড়ালসড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কিন্তু এসব অর্জনের পাশাপাশি ব্যাংক খাত, কর ব্যবস্থা, রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ পরিবেশ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রয়োজন ছিল। অবকাঠামো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, কিন্তু দুর্বল প্রতিষ্ঠান সেই সুফলকে দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না।

দ্বিতীয়ত, প্রবৃদ্ধির গুণগত মান যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। প্রবৃদ্ধির হার বাড়লেই যে কর্মসংস্থান, আয় ও উৎপাদনশীলতা একই অনুপাতে বাড়বে, তার নিশ্চয়তা নেই। অর্থনীতির সম্প্রসারণের সুফল কতটা মানুষের কাছে পৌঁছেছে, নতুন কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল খাতে গেছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও উন্নয়ন মূল্যায়নের অংশ হওয়া প্রয়োজন ছিল। রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক অভিঘাতের সময় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখার যে ভূমিকা পালন করে, বাংলাদেশে তার ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে।

তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে কঠিন করে তুলছে। নতুন বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান বিদেশী প্রতিষ্ঠানের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগও এফডিআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু নতুন ইকুইটি বিনিয়োগের প্রবাহ, উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন আকর্ষণের সক্ষমতা দিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশের প্রকৃত অবস্থা বিচার করা প্রয়োজন। নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, কর ব্যবস্থার পূর্বানুমানযোগ্যতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিশ্চিত না হলে কেবল প্রণোদনা দিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।

বাংলাদেশের সামনে তাই কাজটি শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো নয়; বরং প্রবৃদ্ধির ভিত্তি পুনর্গঠন করা। প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ, খেলাপি ঋণ আদায়, জালিয়াতির জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা শক্তিশালী করা। ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও অভিন্ন নীতি প্রয়োজন, যাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের এক করে দেখা না হয়।

একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, কর ব্যবস্থার সংস্কার, ব্যবসার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কমানো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া ও কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকি মোকাবেলায় শ্রমিকদের সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কাজ সৃষ্টিতে কার্যকর নীতি জরুরি। তরুণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে জনমিতিক লভ্যাংশ অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বাংলাদেশের প্রথম গল্পটি ছিল সম্ভাবনার; দ্বিতীয়টি সেই সম্ভাবনার পথে জমে ওঠা দুর্বলতার। একটিকে সত্য প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যটিকে অস্বীকার করলে চলবে না। অবকাঠামো নির্মাণ, দারিদ্র্য হ্রাস ও আয় বৃদ্ধির অর্জন যেমন বাস্তব, তেমনি ব্যাংক খাতের সংকট, বিনিয়োগের দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ঘাটতিও বাস্তব।

তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছিল। কিন্তু সেই মহাসড়ককে টেকসই করতে যে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রয়োজন, তা যথেষ্ট শক্তিশালী করা যায়নি। এখন প্রয়োজন সেই ভিত্তি নতুন করে নির্মাণ করা। কারণ পরিসংখ্যান দিয়ে প্রবৃদ্ধির সাফল্য দেখানো যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রয়োজন সুশাসন, উৎপাদনশীলতা ও মানুষের জন্য কাজের সুযোগ।

মো. কায়সার হামিদ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

বাংলাদেশ ফাইন্যান্স পিএলসি