বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ মানুষের মৃত্যু বা দীর্ঘমেয়াদি পক্ষাঘাতের প্রধানতম কারণ হলো স্ট্রোক। কেবল যথাসময়ে চিকিৎসা নিশ্চিত হলে স্ট্রোকের মৃত্যুসহ অন্যান্য ঝুঁকি কমানো যায়। স্ট্রোকের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘যথাসময়’ বলতে বোঝানো হয় স্ট্রোক হওয়ার প্রথম সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা নেয়া, যাকে বলে গোল্ডেন আওয়ার বা সোনালি সময়। যেমন মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি তথা ইসকেমিক স্ট্রোকের চিকিৎসায় থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে এটা প্রথম সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাংলাদেশে স্ট্রোকের রোগীদের অধিকাংশের চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব প্রায় ১৪ ঘণ্টার বলে ‘ফ্যাক্টরস অ্যাসোসিয়েটেড উইথ লেট হসপিটাল অ্যারাইভাল ইন অ্যাকিউট স্ট্রোক পেশেন্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় উঠে এসেছে। এর পেছনে রয়েছে স্ট্রোকের লক্ষণ শনাক্ত করতে না পারা, হাসপাতালে নেয়ার সিদ্ধান্তে দেরি, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে বিশেষায়িত রেফারেল হাসপাতালে স্থানান্তরে দীর্ঘসূত্রতা, আধুনিক চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতার বড় দায়। অর্থাৎ জনসচেতনতা থেকে শুরু করে অবকাঠামোর অভাবে স্ট্রোকের রোগীদের ঝুঁকি বাড়ছে।

দেশে স্ট্রোকের চিকিৎসা ও প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রথমেই প্রয়োজন সাধারণ মানুষের মধ্যে রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। অনেকেই স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশের হাত বা পা হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়া এবং কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলেও অনেকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। কেউ কেউ অপেক্ষা করেন, আবার কেউ বাড়িতে প্রাথমিকভাবে চিকিৎসার চেষ্টা করেন। এতে জরুরি চিকিৎসা নেয়ার মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। অথচ স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করা রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রচারণার মাধ্যমে স্ট্রোকের লক্ষণ এবং করণীয় সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। বিশেষ করে রোগীর স্বজনদের বুঝতে হবে, স্ট্রোকের সন্দেহ হলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা সম্প্রসারণও জরুরি।

বর্তমানে দেশে সর্বাধুনিক স্ট্রোক চিকিৎসার সুযোগ সীমিতসংখ্যক হাসপাতালে রয়েছে। অন্যদিকে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার প্রতি হাজারে প্রায় ১১ জন। ২০২৪ সালে দ্য ল্যানসেট নিউরোলজিতে প্রকাশিত ‘গ্লোবাল বারডেন অব ডিজিজ (জিবিডি)’ শীর্ষক গবেষণায় দেশে ২০২১ সালে ২ লাখ ২১ হাজার স্ট্রোকের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় স্ট্রোক চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। নয়তো হাসপাতালে দেরিতে পৌঁছানোর বড় কারণটি রয়েই যাবে।

এক্ষেত্রে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে স্ট্রোক শনাক্তকরণ ও জরুরি চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সব হাসপাতালে একসঙ্গে জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতি চালু করা সম্ভব না হলেও অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে স্ট্রোক শনাক্তকরণ, জরুরি মস্তিষ্কের স্ক্যান, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী এবং দ্রুত রোগী স্থানান্তরের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে। কোন হাসপাতালে কী ধরনের চিকিৎসা পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করে একটি সমন্বিত রেফারেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ও অপ্রয়োজনীয় দেরি এড়ানো যাবে। পাশাপাশি জরুরি বিভাগে স্ট্রোকের সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

স্ট্রোকের চিকিৎসায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক, নার্স, জরুরি বিভাগের কর্মী ও অ্যাম্বুলেন্সকর্মীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করতে এবং যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারেন। প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রের সঙ্গে বিশেষায়িত হাসপাতালের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন। রোগী স্থানান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা গেলে চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে জেলা পর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়লে রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপও কমবে।

স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, কারণ অনেকেই কোনো উপসর্গ না থাকায় এ সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সমন্বিত করা গেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের বোঝাও কমানো সম্ভব।

স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। তাই সচেতনতামূলক প্রচারণার পাশাপাশি জরুরি পরিবহন, দ্রুত রোগ নির্ণয়, দক্ষ জনবল এবং বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। রোগী যেন বাসস্থান বা আর্থিক সামর্থ্যের কারণে সময়মতো চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসাসেবার পরিসর সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্ট্রোকজনিত মৃত্যু, পক্ষাঘাত ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার বোঝা কমানো সম্ভব।