দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং, রাইডশেয়ারিং, খাবার ও পণ্য সরবরাহ, অনলাইন কনটেন্ট তৈরি কিংবা অ্যাপভিত্তিক বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছেন। একসময় বাড়তি আয়ের মাধ্যম হিসেবে এসব কাজকে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু এটিই বর্তমানে অনেকের জীবিকার প্রধান উৎস, যাকে বলা হচ্ছে গিগ জব বা গিগ ইকোনমি (অর্থনীতি)। তবে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী গিগ অর্থনীতির আকার বাড়ছে। কিন্তু এ দেশে গিগ অর্থনীতির বিকাশের প্রেক্ষাপটটি অন্তত বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন।
শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এবং উপযুক্ত চাকরি পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার বাস্তবতায় গিগ ইকোনমি তথা গিগ অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটছে দেশে। গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে ৮৭ লাখের। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে গিগ অর্থনীতি বেকার ও কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের আয়ের বিকল্প পথ তৈরি করছে। এ দিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক। তবে বাস্তবতা হলো, এ খাতের সম্প্রসারণকে দেশের কর্মসংস্থান সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
দেশে বর্তমানে গিগ অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন ই-কমার্স, রাইডশেয়ারিং প্রতিষ্ঠান ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ থেকে সাড়ে ৩৭ লাখ। ফ্রিল্যান্সিং খাতেই যুক্ত রয়েছে প্রায় ১১ লাখ ৫০ হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে সক্রিয় প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার। অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং থেকে বার্ষিক আয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। অন্যদিকে রাইডশেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবাও বিপুলসংখ্যক মানুষের আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে গিগ খাতের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক বাজারে কাজের সুযোগ এবং তুলনামূলক নমনীয় কর্মপরিবেশ এ খাতের সম্ভাবনাকে বিস্তৃত করেছে।
তবে গিগ অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে কর্মসংস্থানের গুণগত মানের প্রশ্নটিও বিবেচনায় নেয়া জরুরি। এ খাতে কাজের স্বাধীনতা থাকলেও অধিকাংশ কর্মীর আয় নির্ভর করে কাজের পরিমাণ, গ্রাহকের চাহিদা এবং প্লাটফর্মের নীতির ওপর। ফলে নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা থাকে না। রাইডশেয়ারিং ও ডেলিভারি কাজে নিয়োজিতদের দুর্ঘটনার ঝুঁকি, কর্মঘণ্টার অনিশ্চয়তা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ রয়েছে। অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সারদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতা, কাজের অনিশ্চয়তা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সম্প্রসারণে গ্রাফিক ডিজাইন, অনুবাদ, ডেটা এন্ট্রি ও কনটেন্ট তৈরির মতো কাজের বাজারও পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থাৎ গিগ অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও সেখানে দীর্ঘমেয়াদে কর্মজীবনের নিশ্চয়তা নেই। ফলে এতে নিয়োজিতদের আর্থসামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত নয়।
এগুলোর সমাধান হতে পারে যদি গিগ অর্থনীতিকে একটি কাঠামোয় আনা যায়। এ নিয়ে সরকারের পরিকল্পিত নীতিমালা থাকতে পারে। কর্মীদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, কাজের ধরন, আয় ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি শ্রম আইন ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় তাদের অন্তর্ভুক্তির উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা বীমা, অবদানভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, সহজে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্লাটফর্ম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব ও জবাবদিহির সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা দরকার। তবে নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে এ খাতের উদ্ভাবন, কাজের নমনীয়তা ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষতা উন্নয়ন। দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাত আন্তর্জাতিক বাজারে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করলেও এ সাফল্য ধরে রাখা সহজ হবে না। এআই ও অটোমেশনের কারণে কাজের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই তরুণদের কেবল প্রচলিত ফ্রিল্যান্সিং দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করলে চলবে না। প্রযুক্তির নতুন ব্যবহার, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন, সৃজনশীল কাজ ও বিশেষায়িত পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সংযোগ তৈরি করা জরুরি। গ্রাম ও শহরের তরুণদের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতেও ডিজিটাল অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সেবায় প্রবেশাধিকার সহজ করতে হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গিগ অর্থনীতির প্রসার যেন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যর্থতা আড়াল করার উপায় হয়ে না ওঠে। বিপুলসংখ্যক তরুণকে অনিশ্চিত আয়ের কাজে যুক্ত হতে হচ্ছে—এটি যেমন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা, তেমনি শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতারও প্রতিফলন। শিল্পের বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে মানসম্মত কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদার সংযোগও জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু প্রবৃদ্ধি নয়, সেই প্রবৃদ্ধি কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে এবং কী ধরনের কাজের সুযোগ সৃষ্টি করছে, সেটিও উন্নয়ন মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হওয়া উচিত।
গিগ অর্থনীতি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু কর্মসংস্থান সংকটের বিকল্প হিসেবে গিগ অর্থনীতির বিস্তার হওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়, বরং নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থিতিশীল কাজের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া উচিত দেশের শ্রমবাজারের প্রধান লক্ষ্য।










