ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ঘিরে দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপের যে হুমকি দিয়েছিলেন, সে অবস্থান থেকে সাময়িকভাবে সরে এসেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার রাতে হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের তিনি এমনটাই জানিয়েছেন বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানানো হয়েছে, ইরানে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের, কোনো নির্বাহী আদেশও নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আজ অনেকগুলো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলো কার্যকর হবে না। আমরা এসব তথ্য যাচাই করে দেখব।’
এদিকে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নিয়ে কিছুটা নমনীয় সুরেই কথা বলেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পকে কী বার্তা দিতে চান—এমন প্রশ্নে আরাঘচি বলেন, ‘আমার বার্তা হলো, যুদ্ধ আর কূটনীতির মধ্যে কূটনীতিই ভালো পথ, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কোনো ভালো অভিজ্ঞতা নেই। তবু যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতি অনেক ভালো।’
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের নির্দেশে দেশটির বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ এবং এর সঙ্গে থাকা ‘স্ট্রাইক গ্রুপ’ দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রচারমাধ্যম নিউজ নেশনের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
গতকাল নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) জানিয়েছে, ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে।
গত কয়েকদিনে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা ভয়ংকর রূপ নেয়। একদিকে বিক্ষোভকারীদের নির্বিচারে হত্যা, অন্যদিকে ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির পর ইরানের পাল্টা হামলার ঘোষণা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে। এর মধ্যেই কাতারের উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে সামরিক বাহিনীর কিছু সদস্যকে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত, বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের ইরান ত্যাগের পরামর্শ—সবকিছুই দুই পরাশক্তির মধ্যে আসন্ন সহিংসতার বার্তা দিচ্ছিল।
একই সময় মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, পেন্টাগন ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একাধিক সামরিক বিকল্প উপস্থাপন করেছে। যার মধ্যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোও রয়েছে। সাইবার হামলা বা ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আঘাত করার মতো বিকল্পগুলো তুলনামূলকভাবে সম্ভাব্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বলেছে, বুধবার বিকাল থেকে শুরু করে রাতজুড়ে ইসরায়েল ইরানে ট্রাম্পের সম্ভাব্য কোনো পদক্ষেপের আশঙ্কায় প্রস্তুত ছিল। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা মূলত নীরবই ছিলেন। তারা জানতেন, ওয়াশিংটন দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা নিলে তেহরান আন্দোলনকে বিদেশী মদদপুষ্ট বলে প্রচার করার সুযোগ পাবে।
ট্রাম্পের হামলার হুমকির মুখে ইরান জানিয়ে দেয়, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে তারা যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে তুরস্ক পর্যন্ত আঞ্চলিক দেশগুলোকে বার্তা দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানা হবে।
এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন, তিনি যেন ইরানে হামলার পথে না এগোন। কেননা তার এ পদক্ষেপ নিশ্চিতভাবেই ইরানকে পাল্টা হামলার দিকে নিয়ে যাবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করবে।
বুধবার সন্ধ্যায় হারেৎজ ও ওয়াশিংটন পোস্টের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল রাশিয়ার মাধ্যমে ইরানকে জানিয়েছে, তারা যদি আগে হামলা না করে, তাহলে ইসরায়েলও হামলা চালাবে না। ইরান এ বোঝাপড়ায় সম্মত হয়েছে।
এরপরই ধীরে ধীরে সতর্ক অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, বুধবার বিকালে ট্রাম্পের মন্তব্যের পর পেন্টাগন তাদের সামরিক বাহিনীকে সতর্ক অবস্থান থেকে সরিয়ে ঘাঁটিতে ফেরার পরিকল্পনা করে। পত্রিকাটি আরো জানায়, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে দূরপাল্লার বোমারু বিমানগুলোকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছিল, তবে বিকাল শেষের আগেই নীরবে সে প্রস্তুতিও স্থগিত করা হয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে ইরান প্রায় সব ধরনের ফ্লাইটের জন্য নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। লুফথানসাসহ বিভিন্ন এয়ারলাইনস জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তারা ইরান ও ইরাকের আকাশসীমা এড়িয়ে চলবে। তবে এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আকাশসীমা আবার খুলে দেয়া হয়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য, সামরিক হামলার হুমকি এবং হঠাৎ সে অবস্থান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত এক আপাত অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—এ আপাত অনিশ্চয়তা কি কৌশলগত, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য, নাকি দুটিরই মিশ্রণ। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ট্রাম্পের এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য, ইরানের দমন-পীড়ন ঠেকানো এবং হামলা ছাড়াই তেহরানকে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করা।










