এ ধরনের কোনো দুর্ঘটনার খবর পেলে চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের আশপাশের হাসপাতালে ছুটে যান রাম কুমার আর্যাল। এবারও ব্যতিক্রম হলো না। বুধবার দুপুরেও চিতওয়ানের বাফার জোনে লাউখানি গ্রামের পাশে একটি গন্ডারের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়েছেন তিনজন নারী। আহতদের পায়ে ও পাঁজরে ভাঙা হাড়, কোমর ও হাঁটুতে গভীর কামড়ের চিহ্ন— হাসপাতালে তাদের ব্যান্ডেজ করা হয়েছে, চলছে চিকিৎসা।

পরে আর্যাল গার্ডিয়ানের ওই প্রতিবেদককে জানান, ‘গন্ডার সাধারণত নিরামিষাশী, কিন্তু বিপদের সময় তারা তীক্ষ্ণ দাঁত ব্যবহার করে আক্রমণ করে। এই দাঁত তিন ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।’

আর্যাল বলেন, ‘এটা কষ্টকর, কিন্তু আমাদের মেনে নিতে হবে—আমরা আর কী-ই বা করতে পারি? এ প্রজাতিকে আমাদের রক্ষা করতেই হবে। এটা গন্ডারের দেশ, যেখানে মানুষও বাস করে।’

চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানের আশপাশে এমন ঘটনা বিরল নয়। শুধু গত ছয় মাসেই বাফার জোনে আটজন মানুষ গন্ডারের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন। ৭৫০ বর্গকিলোমিটারের এই অঞ্চলে বসবাস করছে প্রায় ৪৫ হাজার পরিবার। এমনকি ছোট শহর ও বাজারেও দেখা মেলে গন্ডারের—তারা রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে হেঁটে যায়, মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়ায়, হোটেলের লনে বিশ্রাম নেয় কিংবা লোকজনের বাগানে ঘাস খায়। মানুষ কৌতূহলী হলেও সবসময় সতর্কভাবেই তাদের সংস্পর্শে আসে।

আজকের ঘটনায় যে তিন নারী গন্ডারের আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছেন, তাদের জীবন বাঁচানোর গল্পটিও নাটকীয়। তারা দৌঁড়ে একটি ফাঁপা গাছের থেতর ঢুকে পড়েছিলেন—সেই আশ্রয়ই তাদের জীবন রক্ষা করে।

রাম কুমার আর্যাল জানান, তিনি নিজেও গন্ডারের সহিংসতার শিকার একটি পরিবার থেকে এসেছেন। তার একজন চাচা দু বছর আগে জঙ্গলে সবজি তুলতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। পরে তার মরদেহ পাওয়া যায় গন্ডারের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়।

১৯৭৩ সালে যখন চিতওয়ান জাতীয় উদ্যান স্থাপিত হয়, তখন মাত্র ১০০টি বড় একশৃঙ্গী গন্ডার ছিল। এখন শুধু চিতওয়ানেই গন্ডার রয়েছে প্রায় ৭০০টি—যা নেপালের মোট গন্ডার সংখ্যার ৯০ শতাংশ। একইসঙ্গে, বাফার জোনে মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। এই এলাকায় এখন তিন লাখ মানুষ বাস করছে। মানুষ ও গন্ডার— উভয়েরই সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়ছে সংঘর্ষও। শুধু গন্ডারই নয়, এ এলাকায় হাতি, বাঘ ও ভালুকের আক্রমণেও মানুষ নিহত হচ্ছে।

বিভিন্ন গ্রামে কিছু ‘ঘরোয়া’ গন্ডারও আছে— যেগুলোকে বন্য পরিবেশ থেকে উদ্ধার করে পোষ মানিয়ে পালন করা হয়েছে। এদের মধ্যে আছে মেঘৌলি— যাকে এনটিএনসির (ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর ন্যাচার কনজারভেশন) কর্মীরা ছোটবেলায় বন্যার কবল থেকে উদ্ধার করে লালন-পালন করে আসছেন। এখন সে মোটামুটি একটি প্রাপ্তবয়স্ক ঘোড়ার সমান বড়। তাকে আবার বনে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হলে, সে ফিরে যেতে চায়নি—বড় পুরুষ গন্ডারদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সে টিকে থাকতে পারেনি।

আরও রয়েছে পুষ্পা ও অঞ্জলি—দুই অনাথ গন্ডার, যাদের মা ছোটবেলাতেই ফেলে চলে গিয়েছিল। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে তাদের সদ্ভাব সৃষ্টি হয়েছে। তারা কারো কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু বিপদ ঘটে তখন, যখন বুনো গন্ডারকে ভুল করে ‘ঘরের’ গন্ডার ভেবে কেউ কাছে যায়—এমনই এক ঘটনায় সম্প্রতি প্রাণ হারিয়েছেন একজন।

এ অঞ্চলের মানুষজনের মনোভাব জটিল। একদিকে, তারা গন্ডারদের ভালোবাসে—তাদের খাওয়ায়, পানি দেয়, তাদের উপস্থিতিতে পর্যটনের বিকাশ ঘটে, বিদেশী মুদ্রা আসে। অন্যদিকে, গন্ডার যদি ফসল নষ্ট করে বা প্রাণনাশ করে, তখন ভেতরে ক্ষোভও জন্ম নেয়। অনেক সময় ক্ষতিপূরণ চাইলেও তা সময়মতো বা পর্যাপ্ত পরিমাণে মেলে না। বন্য প্রাণীর আক্রমণে কারো মৃত্যু হলে সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয় ১০ লাখ নেপালি রুপি—কিন্তু জীবন কি টাকায় মাপা যায়?

স্থানীয় থারু জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, বীরেন্দ্র মহাতো বলেন, ‘আমার চেনাজানা ২০ জনেরও বেশি মানুষ গন্ডারের আক্রমণে মারা গেছেন। আমার মা-বাবা একসময় পার্কের ভেতরেই বাস করতেন, কিন্তু ১৯৭৩ সালে পার্ক ঘোষণার পর তাদের সরিয়ে নেয়া হয়। এখন যাদের জমি নেই, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত—কারণ তাদেরই প্রতিদিন জঙ্গলে যেতে হয় জ্বালানি বা ঘাস আনতে, আর সেখানেই হামলার ঝুঁকি থাকে।’

গবেষণা বলছে, যারা পার্কের কাছাকাছি থাকেন এবং পার্কের সম্পদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল, তারাই গন্ডারদের প্রতি বেশি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। তবুও, ২০০ জনের মধ্যে মাত্র দুজন বলেছেন তারা গন্ডার সংরক্ষণে আগ্রহী নন। এই বাস্তবতাই তুলে ধরে এক গভীর সত্য—ভয়, ক্ষতি ও মৃত্যুর মধ্যেও গন্ডারের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান হারায়নি এ জনপদের মানুষ। গন্ডার শুধু বন্যপ্রাণী নয়, তারা এই ভূখণ্ডের চিহ্ন, এর ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের অংশ।