ইসরায়েলি হামলায় স্বামী ও বড় ছেলে নিহত হওয়ার পর চরম অসহায় অবস্থায় পড়েছিলেন গাজার মাজদা। ইঁদুরে ভরা, নর্দমার দুর্গন্ধে ঘেরা একটি জরাজীর্ণ তাঁবুতে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন তিনি। মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকা এ মা শেষ পর্যন্ত ১৩ ও ১৪ বছর বয়সী দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। কারণ মেয়েদের নিরাপত্তা ও ভরণপোষণের আশ্বাস পেয়েছিলেন তিনি।

মাজদা বলেন, ভেবেছিলাম আমি তাদের রক্ষা করছি। ভয় আমাকে ভেতর থেকে মেরে ফেলছিল।

বিশেষজ্ঞ ও সরকারি তথ্যানুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ কিশোরীদের বিয়ের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। অঞ্চলটির বাসিন্দাদের প্রায় সবাই ঘরছাড়া, অধিকাংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর শিবিরে বসবাস করছেন এবং ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। এ পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার আর্থিক স্থিতিশীলতার আশায় অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে।

তবে অল্পবয়সী মেয়েদের কাছে বিয়ের অর্থ হচ্ছে শৈশব, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলা, আর অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ। মাজদার দুই মেয়ের ক্ষেত্রে এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতন।

ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের আগে গাজায় বাল্যবিবাহ ধীরে ধীরে কমে এসেছিল। এ বিষয়ে সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশ হয় ২০২২ সালে। সেখানে বলা হয়েছিল, মোট বিয়ের ১৭ দশমিক ৮ শতাংশে কনের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। ২০১৫ সালে যা ছিল ২২ শতাংশের বেশি।

কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের সুযোগ বাদ দিয়ে গাজায় বিয়ের ন্যূনতম আইনগত বয়স ১৭ বছর। জাতিসংঘ ও অধিকাংশ মানবিক অধিকার সংস্থা ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়েকে ‘প্রারম্ভিক বিয়ে’ হিসেবে বিবেচনা করে।

তবে যুদ্ধের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। গাজার সুপ্রিম শরিয়াহ কোর্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিবন্ধিত ৩৫ হাজার ৪৭৪টি বিয়ের মধ্যে ২০ দশমিক ৬ শতাংশে কনের বয়স ছিল ১৮ বছরের কম। এর মধ্যে ৬২৭টি ক্ষেত্রে মেয়েদের বয়স ছিল ১৫ বছরেরও কম।

Fear of 'lost generation' as Gaza school year begins with all classes shut

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ছবি: রয়টার্স

গাজার উইমেনস অ্যাফেয়ার্স সেন্টারের পরিচালক আমাল সিয়ামের মতে, বিয়ের প্রকৃত হার আরো বেশি হতে পারে। কারণ যুদ্ধের বিশৃঙ্খলায় অনেক বিয়েই নিবন্ধিত হয়নি। আদালতের তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম পূর্ণ বছরে, অর্থাৎ ২০২৪ সালে বিয়ের নিবন্ধন ৩৫ শতাংশ কমে যায়।

১৩-১৬ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া ছয় কিশোরী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে বার্তা সংস্থা এপি। প্রায় সব অভিভাবকই বলেছেন, যুদ্ধ না হলে তারা কখনো এত অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতেন না।

এক ১৬ বছর বয়সী কিশোরী বলেন, ‘পরিবারের সামান্য খাবারের ভাগ নেয়ার জন্য নিজেকেই ক্ষমা করতে পারছিলাম না।’

সাক্ষাৎকারের সময় তার বয়স ছিল ১৭ বছর এবং পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

১৭ বছর বয়সে বিয়ে হওয়া আরেক কিশোরী বলেন, ‘জীবনে স্বাভাবিকতার একমাত্র অনুভূতি ফিরিয়ে আনার উপায় বলে মনে হয়েছিল বিয়ে।’

যুদ্ধের কারণে গাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক মেয়েই শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলেছিল।

মাজদার বড় মেয়েকে স্বামীর পরিবারের কাছে পাঠানোর পর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। মেয়েটির ভাষ্য, ‘আমি চিৎকার করতাম, আর সে আমাকে মারত।’

তিনি অভিযোগ করেন, এক পর্যায়ে শাশুড়ি তার হাত বেঁধে দেন এবং এরপর স্বামী তাকে ধর্ষণ করেন। পরে বারবার একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়।

১৩ বছর বয়সী ছোট মেয়েটিও একই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ করেছে। তার দাবি, স্বামীর লাথির আঘাতে তার দুইবার গর্ভপাত হয়েছে।

কয়েক মাস পর দুই বোনই মায়ের কাছে পালিয়ে আসে। পরে জানা যায়, ছোট মেয়েটিও অন্তঃসত্ত্বা।

মধ্য গাজার আওদা হাসপাতালের মাতৃসেবা বিভাগের প্রধান ইয়াসের শাবান জানান, যুদ্ধ চলাকালে কিশোরী গর্ভধারণের হার বেড়েছে। অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে অনেকেই গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতায় ভুগেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপুষ্টি।

এপির সঙ্গে কথা বলা চার কিশোরীর সবাই সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তাদের প্রত্যেকেই ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণ বা প্রসবের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তিনজনের অন্তত একবার গর্ভপাত হয়েছে।

১৬ বছরের এক কিশোরী প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্তান জন্মের পর অনেক দিন অচেতন ছিলাম। কিছু সময় পর্যন্ত মেয়েকে কোলে নিতেও পারিনি।’

বর্তমানে পারিবারিক ও সামাজিক চাপের মুখে মাজদার দুই মেয়েই আবার স্বামীর কাছে ফিরে গেছেন। মেয়েরা ফিরে যেতে চাননি বলে জানান মাজদা।

তিনি বলেন, ‘তারা ফিরতে চায়নি। কাঁদছিল।’

এপি অবলম্বনে