দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে টানা ভারি বর্ষণ, বন্যা ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা ও মালয়েশিয়ায় এসব দুর্যোগে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৮০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছতে হিমশিম খাচ্ছেন, অনেক জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। খবর সিএনএন ও বিবিসি।

ইন্দোনেশিয়া: ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় সেনইয়ারের কারণে ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যা দেখা দিয়েছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৪৪২ জন মারা গেছে এবং ২৭৯ জন নিখোঁজ রয়েছে। নদীর পানি দ্রুত বাড়ায় অনেক এলাকা মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে গেছে। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টারে করে ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে। বন্যা থেকে বাঁচতে অনেক বাসিন্দা আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে।

থাইল্যান্ড: মালাক্কা প্রণালিতে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলও ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। সরকারি মুখপাত্র সিরিপং অ্যাঙ্গকাসাকুলকিয়াত জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ১৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাত ইয়াই শহর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এ শহরে এমন বৃষ্টি ৩০০ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম। পানির উচ্চতা কিছু এলাকায় আট ফুটেরও বেশি। প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাতৃসদন, হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা ডুবে গেছে। সেনা ও উদ্ধারকর্মীরা হেলিকপ্টারে ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও জরুরি সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছেন। সোংখলা প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকার ১০ জন পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক এলাকায় এখনো বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।

শ্রীলংকা: শ্রীলংকায় ঘূর্ণিঝড় ডিটওয়ারের কারণে ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধসে ১৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাঁচ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১৯১ জন নিখোঁজ রয়েছে। প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছে।রাজধানী কলম্বোর আশপাশের এলাকাগুলো এখনো পানিতে ডুবে আছে এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী ও ধর্মীয় সংগঠনগুলো ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রান্না করা খাবার বিতরণ করছে।

মালয়েশিয়া: ঘূর্ণিঝড় সেনইয়ার আঘাতে মালয়েশিয়ায় দুজনের মৃত্যু হয়েছে। ঝড়ের আগে ৩৪ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে উত্তরের পেরলিস অঙ্গরাজ্যে অনেকেই আটকা পড়ে যায়। পরে উদ্ধারকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। এসব কেন্দ্রে শত শত পরিবার তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ঝড়-বন্যা আরো তীব্র হচ্ছে। মালাক্কা প্রণালিতে বিরলভাবে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় সেনইয়ার ও ফিলিপাইনের টাইফুন কোটোর প্রভাবে পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি মাসেই ভিয়েতনামে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বহু প্রাণহানি ঘটেছে। ফিলিপাইনেও এক সপ্তাহে দুটি টাইফুনে শত শত মানুষ মারা গেছে এবং ১৪ লাখের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে এ ধরনের দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে।