গাজার উত্তরের জাবালিয়া শরণার্থী শিবির। আংশিক ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজের বাড়িতে কফি তৈরি করছিলেন ৮৫ বছর বয়সী আবদেল মাহদি আল-উহেইদি। মাঝে মাঝে চারপাশে ধ্বংসস্তূপের দিক দেখান আর জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো নিয়ে ভাবেন। সেখানে বসেই তিনি সম্প্রতি কথা বলেন আল জাজিরার প্রতিবেদকের সঙ্গে। সেই আলাপে ওঠে এসেছে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের কথা। হারানোর কথা। হতাশার কথা।

পাশেই বসে আছেন স্ত্রী আজিজা, বয়স আশির কোঠায়। ছয় দশক আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। বহু চেষ্টা করেও তাদের সন্তান হয়নি।

এখন মৃত ভাইয়ের পাঁচ ছেলেকে নিয়ে বসবাস আবদেল মাহদির, যার শৈশবে বাবাকে হারিয়েছেন। আবদেল মাহদি তাদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন এবং পরিবার গড়ে তুলতে সাহায্য করেছেন।

১৯৪০ সালে জন্ম আবদেল মাহদির। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিজভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, যা নাকবা নামে পরিচিত। সেই ভয়াবহ স্মৃতি ও যন্ত্রণা নিয়েও তিনি বলেন, বর্তমানে গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনিরা যা সহ্য করছে, তা তার জীবনে দেখা সব কিছুকেই ছাড়িয়ে গেছে।

ক্লান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা বির আল-সাবা (বর্তমান বিরশাবা) থেকে এসেছি… ওটাই ছিল আমাদের মাতৃভূমি।’

নাকাব মরুভূমির সবচেয়ে বড় শহর বির আল-সাবা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলি বাহিনীর দখলে যায় এবং সেখানকার অধিকাংশ ফিলিস্তিনিকে উৎখাত করা হয়।

প্রথম নাকবা

শৈশবের স্মৃতি এখনো স্পষ্ট আবদেল মাহদির কাছে। স্মরণ করতে পারেন সবকিছু বদলে যাওয়ার আগের জীবন। নিজেদের জমিতে বাবা-মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনের দিনগুলো। গবাদিপশু, প্রাচুর্য আর পরিচিত পরিবেশের মধ্যে কাটানো সময়।

তিনি বলেন, জায়নবাদী হাগানাহ মিলিশিয়ারা এগিয়ে আসার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বির আল-সাবার পরিবারগুলোর মধ্যে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছিল। কেউ পালাতে চেয়েছিল, কেউ আবার থেকে যাওয়ার পক্ষে ছিল।

শেষ পর্যন্ত কয়েক সপ্তাহ পর ফিরে আসার আশায় পশ্চিমে গাজার দিকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আবদেল মাহদি, তার বাবা-মা, তিন ভাইবোন এবং বর্ধিত পরিবারের অন্যরা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেন। সঙ্গে নেয়া হয়েছিল যতটুকু সম্ভব গবাদিপশু, অর্থ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

‘আমরা সবাই বেরিয়ে পড়েছিলাম… দিনের পর দিন হেঁটেছি। একটু বিশ্রাম নিতাম, আবার হাঁটা শুরু করতাম। আমরা কিছু জিনিস সঙ্গে নিয়েছিলাম। কখনো ভাবিনি এটা স্থায়ী নির্বাসনে পরিণত হবে।’

প্রথমে পরিবারটি গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় আশ্রয় নেয়। পরে তারা উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে চলে যায়। আর শুরু হয় শরণার্থী জীবনের কঠিন বাস্তবতা।

‘আমরা তাবুতে থাকতাম। বৃষ্টি আর বাতাসে সেগুলো ভেসে যেত, ঠান্ডা ছিল অসহনীয়, পরে আসত তীব্র গরম। ছিল ক্ষুধা, ক্লান্তি, খাবার ও পানির জন্য দীর্ঘ লাইন, যৌথ টয়লেট, উকুন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ… কষ্টের স্মৃতি।’

abdel_mahdi2_al_jazeera

স্ত্রী আজিজার সঙ্গে আবদেল মাহদি আল-উহেইদি। ছবি: আল জাজিরা

ভূমির অধিকার ছাড়তে মানা করেছিলেন পূর্বপুরুষরা

‘আমার বাবা আর দাদাকে সব সময় বলতে শুনেছি যে আমরা ফিরে যাব। তারা সন্তান ও নাতিদেরও ফিরে যাওয়ার অধিকার ধরে রাখতে বলতেন’, বলেন আবদেল মাহদি।

কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি। বরং কেটে গেছে নির্বাসন, যুদ্ধ এবং বারবার জীবন নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা।

কর্মজীবনের অনেকটা সময় তিনি ইসরায়েলের ভেতরে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। ভাইদের সঙ্গে মিলে বাড়িঘর তৈরি করেছিলেন, জমিও কিনেছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ আবার সবকিছু মুছে দিয়েছে।

আবদেল মাহদি বলেন, ‘আমরা কাজ করেছি, ঘর বানিয়েছি, জমি কিনেছি। ভাবছিলাম, বাস্তুচ্যুতির কারণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবন থেকে কিছুটা ক্ষতিপূরণ হয়তো পেয়েছি। মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু এই যুদ্ধ সবকিছু পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আবার আমরা শূন্যে ফিরে গেছি। কিছুই অবশিষ্ট নেই। না পাথর, না গাছ।’

তিনি বলেন, গাজায় জীবন কখনো স্থিতিশীল ছিল না। বারবার ইসরায়েলি যুদ্ধ এবং দীর্ঘ অবরোধ ছিলই। তবে এবারের ধ্বংসযজ্ঞ নজিরবিহীন।

‘জীবনের শুরুতে এক নাকবা... আর জীবনের শেষে আরেক নাকবা। আর কী বলার আছে?’

গাজার যুদ্ধ

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধে আবদেল মাহদির জীবন ওলটপালট হয়ে যায়। এবার বৃদ্ধ বয়সে তাকে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে। বৃদ্ধ স্ত্রী ও ভাতিজাদের পরিবার নিয়ে কষ্ট করে হাঁটতে হয়েছে তাকে।

একবার তিনি পশ্চিম গাজা সিটির সমুদ্রবন্দর এলাকায়, আরেকবার মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

এর আগে তিনি জাবালিয়ার একটি জাতিসংঘ পরিচালিত বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে সেখানে ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালায়।

যুদ্ধের শুরুর মাসগুলোয় ইসরায়েলি ট্যাংক ও সেনারা স্কুলে ঢুকে পড়ে। চারদিকে বিশৃঙ্খলা, গুলির শব্দ আর চিৎকারের মধ্যে লাউডস্পিকারে সবাইকে দক্ষিণে সরে যেতে নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল।

‘তারা আমাদের বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়। আমি আর আমার বৃদ্ধ স্ত্রী একে অপরকে ধরে হাঁটছিলাম। কিছু মানুষ বের হতে পারেনি, সেখানেই মারা গেছে।’

‘আমরা দীর্ঘ পথ হেঁটেছি, শেষ পর্যন্ত পশ্চিম গাজায় পৌঁছেছি, পরিবারের যারা অবশিষ্ট ছিল তাদের নিয়ে। তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল।’

‘আমরা ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছিলাম, কিন্তু গোলাবর্ষণ আর ভয় আমাদের হাঁটতে বাধ্য করছিল।’

তিনি বলেন, প্রথমে তিনি বাড়িতে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে পূর্বপুরুষদের ‘ভুল’ অর্থাৎ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা পুনরাবৃত্তি করতে চাননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিপদের কারণে তাকে পালাতেই হয়।

এ বৃদ্ধের কাছে বাস্তুচ্যুতিই হয়ে উঠেছিল যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকগুলোর একটি। শান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘যখন একজন মানুষ নিজের ঘর ছাড়ে, তখন সে তার মর্যাদা আর মূল্য হারায়। আমরা তাঁবুতে, বালুর মধ্যে, সবকিছুর মুখোমুখি হয়ে বেঁচেছি… দুর্ভিক্ষ আর সবকিছুর অভাবের মধ্যে দিন কাটিয়েছি।’

‘আমি মন থেকে মৃত্যুকেই কামনা করেছি। আমি শুধু একটি কংক্রিটের দেয়াল চেয়েছিলাম, যেখানে ক্লান্ত পিঠটা ঠেকাতে পারি। কিন্তু কিছুই ছিল না। তরুণ-বৃদ্ধ কারো জন্যই এটা সহনীয় ছিল না।’

abdel_mahdi_al_jazeera

আবদেল মাহদি আল-উহেইদি। ছবি: আল জাজিরা

ফিরে আসার স্বাদ

২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর উত্তর গাজার বাসিন্দাদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলে সামান্য আশার সঞ্চার হয়।

আবদেল মাহদি বলেন, তিনি ভেবেছিলেন আর কখনো নিজের বাড়ি দেখতে পারবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে আসতে পেরেছিলেন। সে দেখেন বাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

‘জাবালিয়ায় আমি দশকের পর দশক কাটিয়েছি। যখন দেখলাম অন্তহীন ধ্বংসস্তূপ আর ভাঙা রাস্তায় পরিণত হয়েছে এলাকাটি, তখন গভীর যন্ত্রণা গ্রাস করে আমাকে।’

‘এখন আমি খুব কষ্ট করে লাঠি নিয়ে ভাঙা রাস্তাগুলো পার হই। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে হাঁটতে গিয়ে আমি দুবার পড়ে গেছি।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, ফিলিস্তিনিরা এখন যা পার করছে, তার সঙ্গে তার জীবনের আগের কোনো সময়ের মিল নেই।

আবদেল মাহদি নাকবা, ১৯৫৬ সালের যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ, ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা এবং গাজার আগের যুদ্ধগুলো দেখেছেন। কিন্তু তার মতে, বর্তমান ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে সেগুলোর কোনো তুলনা হয় না।

‘তখন ইসরায়েলিরা আমাদের জমি থেকে সরে গিয়েছিল। আজ গাজার অর্ধেকেরও বেশি জমি দখল হয়ে গেছে। প্রতিদিন আমরা গুলির শব্দ আর ইসরায়েলি সামরিক যানবাহনের আওয়াজ শুনি।’

‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার যে কথা তারা বলেছিল, সেটাও মিথ্যা ছিল’ উল্লেখ করে আবদেল মাহদি বলেন, ‘আমরা টানা তিন বছর ধরে এক চলমান বিপর্যয়ের মধ্যে বাস করছি।’

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

গাজাকে ঘিরে আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন আবদেল মাহদি। তার মতে, ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘদিন ধরেই যুদ্ধ, ক্ষুধা ও অবরোধের মুখে একা পড়ে আছে।

‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে’, তিনি বলেন। ‘প্রতিটি ধাপে আমাদের পরিত্যাগ করা হয়েছে। নির্মম সামরিক যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের একাই দাঁড়াতে হয়েছে। মানুষ যতটা সহ্য করতে পারে, তার চেয়েও বেশি আমরা সহ্য করেছি।’

এই বাস্তবতাই তাকে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে দিচ্ছে না।

তিনি বলেন, ‘সীমান্ত খুলে দেয়া আর পরিস্থিতি উন্নত করার অন্তহীন প্রতিশ্রুতি আমরা শুনি। কিন্তু সবই মিথ্যা। এসব প্রতিশ্রুতি আমাদের জীবন আর আত্মা থেকে বছরের পর বছর কেড়ে নিয়েছে।’

তবু বারবার বাস্তুচ্যুতি, ক্ষতি আর যুদ্ধের মধ্যেও তিনি একটি জিনিস শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে আছেন—নিজের ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক।

‘এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির বদলে যদি আমাকে নিউইয়র্কে প্রাসাদও দেয়া হয়, তবু আমি তা প্রত্যাখ্যান করব।’

তিনি বলেন, ‘যারা অনেক আগে চলে গিয়েছিল, তারা আর ফিরে আসেনি। মানুষের কখনো নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করা উচিত নয়। এখানেই আমি মরব, এখানেই আমাকে কবর দেয়া হবে।’