যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে আগামী ডিসেম্বরে বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে একপক্ষীয় নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। বিরোধী দল ও গণতন্ত্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো এ নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বলছে, এটি হবে সেনাশাসনের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখার প্রহসন। তবে বিতর্কিত এ নির্বাচন ইস্যুতে একই নীতি নিয়েছে চীন ও ভারত। ভাষা ও যুক্তির কিছু পার্থক্য থাকলেও উভয় দেশই প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সমর্থন জানিয়েছে, যা সামরিক সরকারের অবস্থানকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১ সেপ্টেম্বর সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনের সময় মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে তিনি নির্বাচনের প্রক্রিয়া ‘ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হওয়ার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ভারত থেকে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক পাঠানোর ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে ভারত কার্যত জান্তার নির্বাচন আয়োজনকে মেনে নিয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। যদিও ভারত নিজেকে গণতন্ত্রের সমর্থক বলে দাবি করে, তবু তাদের মিয়ানমার নীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং চীনের প্রভাব মোকাবেলা। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অস্থিরতা, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত থেকে সীমান্তে অনুপ্রবেশ, শরণার্থী স্রোত এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা—সব মিলিয়ে দিল্লির কাছে দেশটির স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে তারা সামরিক জান্তার এ নির্বাচনে সমর্থন দিচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারের সামরিক শাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। দেশটি শুধু রাজনৈতিক সমর্থনই দেয়নি, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রকল্পগুলো টিকিয়ে রাখতে এবং সম্প্রসারণে জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্প্রতি মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনের প্রস্তুতিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং ‘শান্তি, উন্নয়ন ও জাতীয় ঐক্যের’ আহ্বান জানিয়েছেন। চীনের কাছে মিয়ানমার একটি কৌশলগত করিডোর, যেখানে রয়েছে চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, বঙ্গোপসাগরমুখী বন্দর, রেললাইন ও জ্বালানি পাইপলাইন। এসব অবকাঠামো ও বিনিয়োগ রক্ষার জন্য স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। আর সেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সামরিক সরকারকে টিকিয়ে রাখার নীতি নিয়েছে বেইজিং। এজন্য চীন নির্বাচনকে সামরিক জান্তার আন্তর্জাতিক বৈধতা তৈরিকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখে।
দুই দেশই প্রকাশ্যে নির্বাচন আয়োজনকে সমর্থন জানাচ্ছে। এর মাধ্যমে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আশা প্রকাশ করছে। যদিও ভাষা ও যুক্তির ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্য আছে। ভারত জোর দিচ্ছে ‘ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হওয়ার ওপর, চীন বলছে ‘শান্তি ও জাতীয় ঐক্যের’ কথা। বিশ্লেষকদের মতে, কার্যত দুই পক্ষই জান্তার আয়োজিত নির্বাচনের ধারণাকে বৈধতা দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে এবং অগ্রাধিকার পায় কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।
লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্পষ্টতই এ নির্বাচন বৈধতা অর্জনের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে। চীন ও ভারত তো বটেই, আমার মনে হয় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রও এ নির্বাচনকে মেনে নেবে। হয়তো প্রকাশ্যে ঘোষণা দেবে না, তবে নমনীয়তা প্রদর্শন করবে। বার্মা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন আসছে। চীন তো আগে থেকেই নির্বাচনে সমর্থন দিয়ে আসছে, এখন ভারতও প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে।’
এ পরিস্থিতি বাংলাদেশ কিছুটা কাজে লাগাতে পারত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে চীন ও রাশিয়াকে সম্পৃক্ত করে সরকার উদ্যোগ নিলে রোহিঙ্গা ইস্যুর কিছু সমাধানমুখী অগ্রগতি আনা যেত। কিন্তু এ মুহূর্তে নির্বাচিত সরকার না থাকায় পরিস্থিতি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচন হয়ে গেলে বার্মা সরকার আর কোনো ছাড় দেবে বলে মনে হয় না। চীন, ভারত ও রাশিয়া যদি তাদের পক্ষে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ যদি নমনীয় হয় তবে তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরো শক্ত অবস্থানে থাকবে।’
কিছুদিন আগে চীনের আমন্ত্রণে মিয়ানমারের সরকারি ও সামরিক প্রতিনিধিরা বেইজিংয়ে গিয়ে অভ্যন্তরীণ শাসন কৌশল, নির্বাচন আয়োজন ও প্রচারপদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এসব পদক্ষেপ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চীনা প্রভাব আরো সুদৃঢ় করছে। যদিও ভারত তুলনামূলকভাবে সংযত ভূমিকা পালন করছে। দিল্লি জান্তার সঙ্গে সরাসরি কৌশলগত সম্পৃক্ততায় না গিয়ে সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং বাণিজ্য রুট নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ভারতের এ নীতি জান্তার জন্য পরোক্ষ সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। যদিও দিল্লি দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে।
অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। চীনের ক্ষেত্রে মিয়ানমার হচ্ছে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের এক গুরুত্বপূর্ণ গেটওয়ে, যা তাকে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে। ভারতের জন্য মিয়ানমার পূর্বোত্তর রাজ্যগুলোর সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থল ও সমুদ্রপথ সংযোগের অন্যতম প্রধান রুট। তাই উভয় দেশই চায় মিয়ানমারে এমন একটি সরকার থাকুক, যার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব। সামরিক সরকার নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে যদি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, তবে বাণিজ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়নে সুবিধা হবে—এ হিসাব দুই দেশই করছে। দুই দেশই জান্তার মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের ওপর দমন-পীড়ন এবং সহিংসতা নিয়ে প্রকাশ্যে তেমন কোনো কঠোর অবস্থান নেয়নি। বরং তারা নির্বাচনের আড়ালে নিজেদের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস)–প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনিরুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়াই এ নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য। এর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ও আছে। সামরিক জান্তা সম্ভবত একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিকীকরণের দিকে যেতে চাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিষয়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখা যাচ্ছে। ভারত ও চীন আগে থেকেই সামরিক জান্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছিল এবং সেটি তারা বজায় রেখেই চলছে। পরবর্তী পর্যায়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসে, বিশেষ করে রাখাইনের পরিস্থিতির দিকে আমাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সেখানে রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে কোনো পরিবর্তন আসে কিনা সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’










