সপ্তাহের পর সপ্তাহ গভীর রাতে ফোনালাপ, খসড়া নিয়ে টানাপড়েন এবং মধ্যস্থতাকারীদের নিরলস প্রচেষ্টা। এসবের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি। তবে এ সমঝোতাকে স্থায়ী ও চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ দেয়া আরো কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। খবর রয়টার্স।
দুই পক্ষ এখন ৬০ দিনের আলোচনায় প্রবেশ করছে, যার লক্ষ্য একটি চূড়ান্ত সমঝোতা অর্জন। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ নানা জটিল বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত পাকিস্তানের চারটি সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছাতেই অসংখ্য বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। কখনো হরমুজ প্রণালিতে প্রস্তাবিত শুল্ক, কখনো লেবাননের যুদ্ধ— এভাবে বিতর্কের বিষয়গুলো কয়েক দিনের ব্যবধানে বদলে গেছে।
এর পর আজ শেষ হতে যাওয়া সপ্তাহের মাঝামাঝিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে পরস্পরবিরোধী অবরোধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে ১৪ দফা একটি সমঝোতা স্মারক ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আলোচনার সময় এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যখন মনে হয়েছে পুরো প্রক্রিয়াই থেমে যাবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাকিস্তানের পাঁচটি সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়ার আগে আলোচনা কয়েকবার ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, এমনকি শেষ রাতেও। ওই সূত্রগুলোর দুজন এবং আলোচনার বিষয়ে অবগত এক কূটনীতিক জানান, কাঠামোগত চুক্তিটি নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত কাতারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল।
কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো কখনো একটি মাত্র শব্দ নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে। মে মাসের শেষ দিকে একটি ধারায় ‘ইত্যাদি’ নাকি ‘অন্তর্ভুক্ত’ শব্দটি ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে ৪৫ মিনিট বিতর্ক চলে। তবে কোন ধারাকে ঘিরে এই বিতর্ক হয়েছিল, তা তিনি উল্লেখ করেননি।
সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিধিনিষেধ—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো আরো কঠিন হবে। কারণ ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো একে অপরের উদ্দেশ্য নিয়ে গভীরভাবে সন্দিহান।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘ওয়াশিংটন ও তেহরান একই নথিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘অস্পষ্টতাকে নিজের কৌশলগত সুবিধায় পরিণত করার চেষ্টা করবে ইরান, আর যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বিষয়ে ছাড় আদায় না হওয়া পর্যন্ত চাপ বজায় রাখতে চাইবে। ফলে মধ্যস্থতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ থাকবে, তবে সেটি সহজ হবে না।’
আলোচনায় সরাসরি যুক্ত হলো কাতার
এপ্রিলের শুরুতে প্রথম দফার আলোচনার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ সবচেয়ে বড় বিরোধের বিষয় হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের চারটি সূত্র জানিয়েছে, মে মাসের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও পাকিস্তানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আহ্বান জানালে আলোচনায় নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়।
একটি সূত্র জানায়, চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একই সময়ে তেহরানে কাতারি প্রতিনিধিদলের আগমন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ দোহা ইরানি নেতৃত্বকে কিছু আর্থিক আশ্বাস দিতে সক্ষম হয়েছিল।
কূটনীতিকের মতে, শুরুতে কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে অনিচ্ছুক ছিল। তবে মে মাসের মাঝামাঝি প্রায় ১০ দিন আলোচনা স্থবির হয়ে থাকার পর এবং সামরিক উত্তেজনা বাড়তে থাকায় তাদের অবস্থান বদলে যায়।
কাতার শর্ত দিয়েছিল যে যুদ্ধবিরতি বহাল থাকতে হবে এবং তাদের ওপর কোনো হামলা হওয়া যাবে না; তবেই তারা আরো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেবে। এরপর কাতারি প্রতিনিধিরা তুরস্ক হয়ে গোপনে পাঁচবার তেহরান সফর করেন এবং পাকিস্তানের খসড়াগুলোর বিভিন্ন ফাঁকফোকর নিয়ে কাজ করেন।
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ মে তেহরান থেকে ইতিবাচক সংকেত নিয়ে ওয়াশিংটনে পৌঁছে কাতারি প্রতিনিধিদল জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে। একই সময়ে তারা হোয়াইট হাউজের ভেতর থেকেই ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে খসড়ায় সংশোধনী আনে।
আলোচনায় সরাসরি জড়িত পাকিস্তানের একটি সূত্র জানায়, শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহই দেখিয়ে দেয় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পরিস্থিতি কতটা অনিশ্চিত ছিল।
সূত্রটি জানায়, গত রোববার রাত ১১টার দিকে পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও একটি সিচুয়েশন রুমে কর্মকর্তারা জড়ো ছিলেন। ঠিক তখনই ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালালে আলোচনা আবারো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।
তার মতে, পুরো রাতজুড়ে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করেন। কয়েক ঘণ্টা পরই চুক্তি চূড়ান্ত হয়।
পরিবর্তিত অবস্থান ও বার্তা আদান-প্রদানে বিলম্ব
পাকিস্তানের চারটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের বারবার পরিবর্তিত জনসম্মুখের বক্তব্য আলোচনাকে জটিল করে তুলেছিল। একই সঙ্গে জরুরি প্রস্তাবের জবাব দিতে ইরানের ধীরগতি সমস্যাকে আরো বাড়িয়েছে।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়ার পর দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অস্বাভাবিকভাবে খণ্ডিত হয়ে পড়ে, যা বিলম্বের অন্যতম কারণ।
আলোচনার বিষয়ে অবগত একটি আন্তর্জাতিক সূত্র জানায়, তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে ইরানিরা অত্যন্ত সতর্ক ছিল। তিনি বলেন, ‘বার্তাগুলো অনেক হাত ঘুরে যেত, তারপর কয়েক দিন পরে ফিরে আসত।’
আলোচনায় যুক্ত পাকিস্তানি সূত্রটি জানায়, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে যখন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির একজন প্রতিনিধি ইসলামাবাদে আসেন। এতে আসিম মুনির ও তার দল আরো সরাসরি যোগাযোগ তৈরিতে সক্ষম হয়।
আন্তর্জাতিক সূত্রটি আরো বলে, দুই পক্ষের সম্পূর্ণ ভিন্ন যোগাযোগ পদ্ধতিতে পাকিস্তান প্রায়ই হতাশ হয়ে পড়েছিল।
তিনি বলেন, ‘মার্কিনদের ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত অবস্থান কী, তা কখনো নিশ্চিতভাবে বোঝা যেত না, আবার সেটি হঠাৎ বদলেও যেত। আর ইরানিদের কাছ থেকে অনেক সময় দিনের পর দিন কোনো স্পষ্ট উত্তরই পাওয়া যেত না।’
দুই দেশই এখন অন্তর্বর্তী চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। তবে কূটনীতিকের মতে, পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর। বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং তার জবাবে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া এই চুক্তিকে ভেস্তে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সূত্রটি বলেন, ‘আমি মনে করি না, এর আগে কখনো এমন কোনো প্রক্রিয়ার এত কাছাকাছি ছিলাম যেখানে পারস্পরিক বিশ্বাসের মাত্রা এত কম ছিল।’










