ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে গাজা উপত্যকার ৭০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর এ পদক্ষেপ এরই মধ্যে নড়বড়ে হয়ে থাকা যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে কার্যত ভেঙে দিতে পারে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
পশ্চিম তীরের একটি ইহুদি বসতিতে আয়োজিত এক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে নতুন পরিকল্পনার কথা জানান নেতানিয়াহু। কয়েক মাস পর অনুষ্ঠিত হওয়া যাওয়া নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে আছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তার নতুন এ মন্তব্যে ইসরায়েলের ভৌগোলিক লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরছি। এখন আমরা গাজার ৬০ শতাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণে আছি। আপনারা জানেন, আমরা ৫০ শতাংশে ছিলাম, এখন ৬০ শতাংশে এসেছি। আমার নির্দেশ হচ্ছে ... ৭০ শতাংশে পৌঁছানো।’
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বুধবার বলেন, সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা। তিনি একে ‘স্বেচ্ছামূলক অভিবাসন’ বললেও মানবাধিকারকর্মীরা এটিকে বসবাসের পরিবেশ অসহনীয় করে তুলে দীর্ঘমেয়াদি জাতিগত নির্মূল অভিযানের পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ইসরায়েলি বাহিনী একটি সীমারেখায় সরে যায়। এর ফলে গাজার ৫৩ শতাংশ এলাকার ওপর ইসরায়েলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে হামাস-নিয়ন্ত্রিত অংশে নিজেদের অবস্থান বিস্তৃত করেছে। একইসঙ্গে তারা একটি ক্রমবর্ধমান ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ ঘোষণা করেছে। ওই সব এলাকায় কারা প্রবেশ করতে পারবে তা নির্ধারণের অধিকার নিজেদের হাতে রেখেছে এবং যাকে হুমকি মনে হবে তার ওপর গুলি চালিয়েও আসছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ইসরায়েল-সমর্থিত সশস্ত্র মিলিশিয়াগুলো যুদ্ধবিরতির সীমারেখা সংলগ্ন এলাকা খালি করার কাজে প্রধান ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। তারা বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে চলে যেতে বলছে।
আট মাস ধরে চলা যুদ্ধবিরতির পুরো সময়জুড়েই ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ‘ইয়েলো লাইন’ সংলগ্ন এলাকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়েছে এবং পশ্চিম গাজার গভীর এলাকাতেও বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এসব হামলায় ৯০০-র বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর আগে দুই বছরে নিহত হয়েছেন ৭৫ হাজারের মতো ফিলিস্তিনি, নিখোঁজ রয়েছেন আরো হাজার হাজার বাসিন্দা।
ইসরায়েলের সামরিক নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ গত অক্টোবরে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি, সেই চুক্তিকে অনুমোদন দেয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার সরাসরি লঙ্ঘন। ওই পরিকল্পনায় শান্তি আলোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত গাজাকে ইসরায়েল ও হামাস-নিয়ন্ত্রিত দুই ভাগে বিভক্ত করে একটি অস্থায়ী ‘ইয়েলো লাইন’ নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় আরো বলা হয়েছিল, ‘কাউকে গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না, এবং যারা যেতে চাইবে তারা স্বাধীনভাবে যেতে ও ফিরে আসতে পারবে। আমরা মানুষকে গাজায় থেকে যেতে উৎসাহিত করব এবং একটি উন্নত গাজা গড়ার সুযোগ দেব।’
ইসরায়েলি বাহিনী এরই মধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের অধিকাংশ অবশিষ্ট ভবন পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করেছে। ফলে গাজার ৭০ শতাংশ এলাকা দখল করা হলে যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া ২২ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের আগের ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশেরও কম জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হবে, যা আগে থেকেই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ছিল।
নেতানিয়াহুর ৭০ শতাংশ দখল পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য চাইলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর একজন মুখপাত্র বিষয়টি ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের’ ওপর ছেড়ে দেন।
যুদ্ধবিরতির পুরো সময়জুড়েই ইসরায়েলি বাহিনী ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকা বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহে গাজায় কাজ করা মানবিক সংস্থাগুলোর প্রধানদের জন্য জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে সাম্প্রতিক দখলের চিত্র ওঠে এসেছে।
উত্তর গাজার জাবালিয়ায় জাতিসংঘ জানায়, ‘প্রতিদিন ট্যাংকের অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে—ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি যেকোনো নড়াচড়াকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।’
দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের পূর্ব দিকেও ইসরায়েলি ট্যাংক অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।










