সুইজারল্যান্ডের ব্লাটেন গ্রাম এখন কেবল স্মৃতির অংশ। কয়েক মাস আগে পাহাড় ও হিমবাহ ধসে গ্রামটি সম্পূর্ণভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ে। আগাম সতর্কবার্তার কারণে প্রায় ৩০০ বাসিন্দা প্রাণে বেঁচে গেলেও তারা হারিয়েছেন বাড়ি, হোটেল, খামার থেকে শুরু করে গির্জাসহ সবকিছু। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ২০২৮ সালের মধ্যে ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ২০২৯ সালে নতুন ঘর নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। তবে এর খরচ অনুমান করা হচ্ছে কয়েকশ’ কোটি ডলার, যা গড়ে প্রতিজনের জন্য প্রায় ১০ লাখ ডলার।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুইজারল্যান্ডে হিমবাহ দ্রুত গলছে এবং পারমাফ্রস্ট দুর্বল হয়ে পড়ছে। পারমাফ্রস্ট আসলে পাহাড়কে স্থিতিশীল রাখার প্রাকৃতিক ‘আঠা’। এটি গলতে থাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। জুরিখ ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গ্লেসিওলজিস্ট ম্যাথিয়াস হুস বলেন, ‘হিমবাহের গলন ও পারমাফ্রস্টের দুর্বলতা একসঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।’
সুইস সরকার প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার ব্যয় করে থাকে। তবে পার্লামেন্টে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ ব্যয়কে ছয় গুণ বাড়াতে হতে পারে। অথচ দেশটির অনেক গ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে অবকাঠামোগত সুরক্ষা দেয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

হোটেল ধসে যাওয়ার আগে ও পরে, ছবি: হোটেল এডেলউইস
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, প্রতিটি গ্রাম পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা উচিত নাকি ঝুঁকিপূর্ণ কিছু গ্রাম পরিত্যাগ করতে হবে? সুইস দৈনিক নয়ে জুর্খার জাইটুং এক সম্পাদকীয়তে এ বিতর্ক উত্থাপন করেছে। সেখানে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ ধরনের দুর্যোগ বাড়তে থাকলে ‘আল্পস রক্ষার জন্য করদাতাদের সীমাহীন অর্থ ব্যয়ের মানসিকতা বদলে যেতে পারে।’
তবে স্থানীয়দের জন্য গ্রাম শুধু বসতি নয়, তাদের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মূলভিত্তি। ব্লাটেনের মতো গ্রামগুলো শত শত বছর ধরে টিকে আছে, যেখানে পাহাড়ি উপভাষা, প্রথাগত মুখোশ উৎসব ও অনন্য জীবনধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে এসেছে।
ব্লাটেন এখনো মাটি, পাথর ও বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে। কিন্তু গ্রামবাসীরা নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। হুসের মতে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের ঘটনা আরো ঘন ঘন ও অনিশ্চিতভাবে ঘটছে। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে।’
পাহাড়ি গ্রামগুলো পুনর্গঠনের খরচ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সুইসদের কাছে আল্পস কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি তাদের জাতীয় পরিচয়েরও অংশ। তাই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ে নেমেছেন ব্লাটেনবাসীরা।










