ফিলিস্তিন অধিকৃত গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৬শে জানুয়ারি রায় দেয় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। রায়ে বলা হয় গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে। তা প্রতিরোধে ইসরায়েলকে অন্তর্বর্তীকালীন জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় আইসিজে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আদালত গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী ১৫৩টি দেশকে গণহত্যা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে তাদের নিজস্ব আইনি বাধ্যবাধকতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

কিন্তু আদালতের এ আদেশের পরও পরবর্তী ২২ মাস ধরে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চলতেই থাকে। অবশেষে ২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হয়, ততক্ষণে নিহতের সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে আর আহতের সংখ্যা পৌঁছায় প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজারে। পুরো সময়জুড়ে ইসরায়েলে বিদেশি অস্ত্রের প্রবাহ এক মুহূর্তের জন্যও কমেনি।

টানা কয়েক মাস ধরে চালানো আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিজে গাজায় গণহত্যার স্পষ্ট ঝুঁকির সতর্কতা দেয়ার পরও বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ও স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধাস্ত্র প্রবেশ করেছে।

বিভিন্ন দেশের কাস্টমস রেকর্ড ও তথ্য অধিকার আইনের আওতায় পাওয়া ইসরায়েলি ট্যাক্স অথরিটির আমদানি সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, তালিকায় থাকা প্রতিটি দেশই আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী। এমনকি অনেক দেশ যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের ওপর আংশিক বা পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তাদের তৈরি সামরিক পণ্যও কোনো না কোনো উপায়ে ইসরায়েলে পৌঁছেছে। আইটিএ এর উপাত্ত অনুযায়ী, আইসিজের আদেশের পর ইসরায়েলের অস্ত্র আমদানি কমার বদলে উল্টো বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সিংহভাগই ছিল গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক।

ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো শীর্ষ পাঁচটি দেশ হলো—যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রোমানিয়া, তাইওয়ান ও চেক প্রজাতন্ত্র। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসরায়েলে ২ হাজার ৬০৩টি সামরিক চালানের প্রবেশ রেকর্ড করা হয়েছে। যার মধ্যে গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং সাঁজোয়া যানের উপাদান অন্তর্ভুক্ত। এ দুই বছরে আমদানিকৃত অস্ত্রের মোট মূল্য ছিল ৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন শেকেল (প্রায় ৮৮৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।

এমনকি ২০২৫ সালের ১০ই অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অস্ত্রের প্রবাহ থামেনি। ২০২৫ সালের শেষ দুই মাসে ইসরায়েল আরো ৩২৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম গ্রহণ করেছে।

ইসরায়েলের ট্যাক্স অথরিটির ৮-ডিজিটের কাস্টমস কোডের ওপর ভিত্তি করে আল জাজিরা প্রায় ৬৫ লক্ষ কাস্টমস এন্ট্রি বিশ্লেষণ করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের মোট আমদানিকৃত অস্ত্রের মূল্যের ৪২ শতাংশেরও বেশি একাই সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ভারত সরবরাহ করেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ এ দুই দেশ মিলেই ইসরায়েলের মোট অস্ত্র চাহিদার দুই-তৃতীয়াংশ মিটিয়েছে।

বাকি সরবরাহকারীদের সম্মিলিতভাবে মোট অস্ত্রের প্রায় ১৯ শতাংশ সরবরাহ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। (যার মধ্যে রোমানিয়া একাই ৮ শতাংশ ও চেক প্রজাতন্ত্র ৩ শতাংশ)। আর দক্ষিণ এশীয় দেশ তাইওয়ান, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুর মিলে প্রায় ৮ শতাংশ অস্ত্র সরবরাহ করেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে গাজা যুদ্ধের সমালোচনা করা বা আইসিজের রায়কে স্বাগত জানানো অনেক দেশও পর্দার আড়ালে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো বন্ধ করেনি। চীন আইসিজের রায় কার্যকরের তাগিদ দিলেও যুদ্ধকালীন ইসরায়েলে ৭১ দশমিক ১ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে, যার ৮৩ শতাংশ গেছে রায়ের পর। একইভাবে সিঙ্গাপুর যুদ্ধবিরতির পক্ষে ভোট দিলেও ২০ দশমিক২ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক পণ্য ইসরায়েলে রপ্তানি করেছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করেন এবং ২০২৪ সালের মে মাসে বাণিজ্য সম্পূর্ণ শূন্যে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেন। কাস্টমস ডেটা বলছে, মে মাসের পর আশদোদ বন্দর দিয়ে তুরস্কের পণ্য আসা বন্ধ হলেও, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং হাইফা বন্দর দিয়ে মেড ইন তুর্কি সামরিক পণ্য ইসরায়েলে প্রবেশ অব্যাহত ছিল। গাজায় যুদ্ধবিরতির তীব্র দাবি জানালেও ব্রাজিল থেকে ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন শেকেল মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ইসরায়েলে গেছে। ব্রাজিল সরকার দাবি করেছে, এগুলো আগ্নেয়াস্ত্রের খুচরা যন্ত্রাংশ বা প্রশিক্ষণ সামগ্রী যা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ছাড়াই রপ্তানি করা যায়।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইসিজের আদেশের পরও যারা ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করে গেছে, তারা গণহত্যার সহযোগী হিসেবে গণ্য হতে পারে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক স্টিফেন হামফ্রেস জানান, ইসরায়েলকে অস্ত্র দেয়া দেশগুলো যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধে অংশীদার হচ্ছে।