সময়টা ২০১৪ সালের মে মাস। গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একক ব্যক্তি ইমেজ কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সফল হয় ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি। ২৬ মে বিকেলে দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের উন্মুক্ত প্রান্তরে ভারতের ১৫তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন মোদি। ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এ আয়োজন চিরস্মরণীয় হয়ে আছে, থাকবে। মোদি এ আয়োজনে সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নজির স্থাপন করেন। ভারতে এর আগে কোন প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী দেশগুলোকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ব্যতিক্রমী এ আমন্ত্রণের পাশাপাশি মোদি স্পষ্ট বার্তা দেন, বিজেপি সরকারের আমলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে অগ্রাধিকার তালিকায় সবার আগে থাকবে প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক।
এর মধ্যে গঙ্গা-যমুনায় অনেক জল গড়িয়েছে। নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্র ক্ষমতার প্রথম মেয়াদ পার করে দ্বিতীয় মেয়াদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। প্রথম মেয়াদে বিদেশনীতি সামলাতে মোদির পাশে ছিলেন ভারতের প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপির ঝানু রাজনীতিক সুষমা স্বরাজ। তিনি এখন প্রয়াত। দ্বিতীয় মেয়াদে সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন পেশাদার কূটনীতিক সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর। মন্ত্রী পরিবর্তনের পাশাপাশি মাত্র ৬ বছরের মাথায় ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মোদি সরকার নিজেদের অবস্থান থেকে আমূল সরে গেছে। প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্কের বার্তা দিয়ে যাত্রা করা নরেন্দ্র মোদি এখন প্রতিবেশীদের সঙ্গে সবচেয়ে বৈরী সময় পার করছেন। মোদি-জয়শঙ্কর জুটির সামনে চির শত্রু পাকিস্তানের সাথে হালে যুক্ত হয়েছে চীনের সঙ্গে বিরোধ।
করোনাকালে ভারতে সম্প্রতি দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের আয়োজনে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি ভার্চুয়াল সম্মেলন আয়োজন করা হয়। দেশ-বিদেশের ঝানু বিশ্লেষকদের পাশাপাশি এতে ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর অংশ নেন। এ আয়োজনে তাঁর কয়েকটি কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। তাদের অনেকে মনে করছেন, জয়শঙ্করের কথায় ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির হাওয়া বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী মোটাদাগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বয়ান ছিল এমন-
• জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বলে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ওটা এখন পুরনো ধারণা হয়ে গিয়েছে। তবে কোনো দিন ভারত কোনো জোটের (প্রভাব বলয়) সদস্য ছিল না। এখনও নেই। কোনো দিন ভারত কোনো জোটে ভিড়বেও না।
• আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো বড় ছাতা নয়। ফলে অনেক দেশই স্বাধীন ভাবে অনেক কিছু করে উঠতে পারছে। করছেও। এতে অবশ্য আমাদের (ভারতীয়দের) কিছু যায় আসেনি। কিন্তু যারা এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে ছিল, সেসব দেশ এখন স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার প্রয়োজন অনুভব করতে শুরু করেছে।
• আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অবস্থান পোক্ত করতে আগামী দিনে ভারত আরো কিছু ঝুঁকি নেবে। পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাধান্য পাবে- এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সমুদ্রের নিরাপত্তা বাড়ানো, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সন্ত্রাসবাদ দমন।
বিশ্ব রাজনীতিতে ন্যাম বা প্রচলিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অস্তিত্ব ফুরিয়েছে, এটা সত্যি। তবে আনুষ্ঠানিক হলেও এর উপস্থিতি এখনো রয়ে গেছে। জওহরলাল নেহেরুর আমলে আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা দেশ ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বয়ান মৃতপ্রায় ন্যামের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যেমনটা মোদির প্রথম শাসনামলে সুষমা স্বরাজের হাত ধরে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য শীর্ষ সম্মেলন বাতিল করতে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে সার্কের কফিনে পেরেক ঠোকা হয়েছিল। তবে জয়শঙ্কর যতই বলুন না কেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আগের মতো সোভিয়েত-মার্কিন বলয় নয় বরং বর্তমানের চীন-মার্কিন বলয়ের বিভাজন অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্তত সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে ভারত সেটা পারছে না।
এস জয়শঙ্কর বরাবরই মার্কিন ঘেঁষা কূটনীতিক হিসেবে পরিচিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঐতিহাসিক ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক পরমাণু চুক্তি সম্পাদনে তার মুখ্য ভূমিকা ছিল। কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়কে নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল, সেটাকে সমঝোতার পর্যায়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন জয়শঙ্কর। তার মুখে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাব কমার কথা প্রকাশ্যে শুনে অবাক হয়েছেন অনেকেই। যেখানে বরাবর জোট নিরপেক্ষতার কথা বলে আসা ভারত এখনো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অনেকটাই ঝুঁকে রয়েছে। সর্বশেষ চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধে এ অবস্থান আরো সুস্পষ্ট হয়েছে।
মার্কিন প্রভাব বলয়ে থাকা দেশগুলোর স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার কথায় জয়শঙ্কর স্পষ্টতই পাকিস্তানকে বড় একটি খোঁচা দিয়েছেন। এক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় মিত্র ছিল ইসলামাবাদ। বিশেষত কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসবাদ দমনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে মার্কিন সহায়তা চির প্রতিদ্বন্দ্বী দিল্লি কখনোই ভালো চোখে দেখেনি। সময়ের পরিবর্তনে এখন পাকিস্তান পুরোপুরি চীনমুখী। দেশটিতে ওয়াশিংটনের স্বার্থ ফুরিয়েছে নাকি পাকিস্তান বেইজিংয়ের কাছে বেশি লাভ পাচ্ছে, সেটা অন্য বিতর্ক। তবে ইসলামাবাদের চীনের প্রতি অধিক ঝুঁকে যাওয়া দিল্লিতে ওয়াশিংটনপন্থীদের অবস্থান জোরদার করেছে, এটা সত্য। যদিও এ পরিস্থিতিতে ভারত কতোটা 'স্বাবলম্বী' হয়েছে বা হচ্ছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।
ভারত এমন একটা সময় পার করছে যখন বাংলাদেশ ছাড়া মোটামুটি সকল প্রতিবেশী দেশের সাথে সীমান্ত বিরোধে জড়িয়ে রয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। সম্প্রতি চীনের সাথে সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীতে রক্ত ঝরেছে। পাকিস্তান সীমান্ত আগের মতোই কখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে তার নিশ্চয়তা নেই। বাদ যায়নি ভূবেষ্টিত ছোট্ট দেশ নেপাল ও ভুটান। নেপাল ভারতের বিরুদ্ধে গিয়ে সীমান্তের বিতর্কিত ভূমি নিজ দেশের মানচিত্রে ঢুকিয়ে নিয়েছে। ভুটান ভারতীয় চাষীদের জন্য সেচের পানি বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তেও বেসামরিক নাগরিক হত্যা বন্ধ নেই। যদিও সেটা ভারতের পক্ষ থেকে একতরফা। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোয় ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার তালিকায় এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহবান খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ। পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের কাছে ধাক্কা খেয়ে দেশটি হয়তো প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্কের পুরনো নীতিতে ফিরতে চাইছে। আর হাওয়া বদলে পেছন থেকে ভূমিকা রাখছে চীনা জুজু।
দিল্লি হয়তো চাইছে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সমান্তরালে এশিয়ায় নিজেদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করতে। সেটা হতে পারে রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক, বাণিজ্যিক- যেকোন মাধ্যমে যোগাযোগ। আর এ ইচ্ছা বাস্তবায়নে প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক ভালো করার বিকল্প নেই। মোদির প্রথম মেয়াদে প্রতিবেশীদের সাথে সাউথ ব্লকের যতোটা মানসিক নৈকট্য ছিল, আগামী দিনগুলোয় জয়শঙ্কর হয়তো সেটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। অতি সম্প্রতি ইরানের চাবাহার বন্দর প্রকল্পে ভারত যে ধাক্কা খেয়েছে, আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নিকট অতীতে দেশটি এতবড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। এখানেও পেছন থেকে কলকাঠি চীনের হাতে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে যোগাযোগ বৃদ্ধির উছিলায় এ ধাক্কা কাটিয়ে ওঠা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার তালিকায় অবশ্যই জায়গা পাবে।
ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ বরাবরের। মহাসাগরের জলরাশিতে চীনা উপস্থিতি এবং পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারসহ ভারতের চারপাশের দেশগুলোয় সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীনের মেগা প্রকল্পের অভিঘাত মোকাবেলায় সাউথ ব্লক আরো কার্যকর উদ্যোগ নেবে, এটা আশা করাই যায়। আর সন্ত্রাস দমনের ইস্যুতে ভারতের অবস্থান সবসময় বেশ কড়া। মুম্বাই হামলার পর সেটা আরো জোরদার হয়েছে। তবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ইস্যুটি কাজে লাগানোর সুযোগ দিল্লি কখনোই হেলায় হারায় না। বর্তমানে সন্ত্রাস দমনে সহায়তার প্রশ্নে ওয়াশিংটনও ইসলামাবাদ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে দিল্লিতে আসন গেড়েছে। চীনা ভীতির মাঝে জয়শঙ্করের হাত ধরে আগামী দিনগুলোয় সন্ত্রাস দমনে দিল্লি-ওয়াশিংটনের এ নজিরবিহীন মিত্রতা শুধুমাত্র আঞ্চলিক রাজনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছাতার তলায় থেকে তিনি বলছেন, ভারত কখনোই কোনও প্রভাব বলয়ে যাবে না। জোটভুক্ত হবে না।
ভারতের সামনে এখন পাকিস্তানের চেয়েও বড় ভীতি চীন। জয়শঙ্কর ওয়াশিংটনে যাবার আগে দীর্ঘদিন বেইজিংয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে তাঁর নিয়োগের সময় মোদি হয়তো ভেবেছিলেন, নয়া দ্বিমেরুকেন্দ্রীক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার সম্পর্কে কিছুটা হলেও ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে। এতে অন্তত ভূখন্ডের বাইরে থেকে আসা চ্যালেঞ্জ কমবে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ম্রিয়মান ইমেজ ফেরাতে মনোযোগ দেয়া যাবে। বাস্তবে মোদির সেই আশা পূরণ হয়নি। ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই আগের তুলনায় কোণঠাসা হয়েছেন তিনি।
মোদি-সুষমার হাত ধরে ভারতের মার্কিনমুখী যাত্রা গতি পেয়েছিল। এখন মোদি-জয়শঙ্কর জুটি দিল্লি-ওয়াশিংটন মিত্রতা আরো মজবুত করতে ভূমিকা রাখছে। প্রভাব বলয়ের ভারসাম্যে বিশ্বাসী ঝানু কূটনীতিক জয়শঙ্করের আমলে চীন সীমান্তে ভারতীয় সেনাদের রক্ত ঝড়েছে। আর সংকটে দিল্লির প্রতি উদার হস্ত বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে বিজেপি সরকারের ক্রমশ আধিপত্যবাদী মনোভাবের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে চীন। 'শত্রুর শত্রু বন্ধু' এ নীতিতে এগিয়ে ভারতের বেশিরভাগ প্রতিবেশী দেশকে নিজেদের প্রভাব বলয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে বেইজিং। পররাষ্ট্রনীতিতে এটাই এখন মোদি-জয়শঙ্কর জুটির মাথা ব্যথার মূল কারণ। কাজেই চীনা ভীতি আগামী দিনগুলোয় ভারতের পররাষ্ট্রনীতির হাওয়া বদলের অন্যতম প্রভাবক হতে যাচ্ছে, এটা অনুমেয়।
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রাক্তন শিক্ষার্থী










