নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে একাধিক গ্রাম, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও সড়ক অবকাঠামো। এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত অন্তত ৪০০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। খবর বিবিসি।
স্থানীয় সময় বুধবার সকালে ৮টা ৩৭ মিনিটে অনুভূত একটি ভূমিকম্পের পর তুষারধস নামে। এতে গলিত বরফের পানি দ্রুত পাহাড়ি নদী ‘ভোটে কোশি’তে আছড়ে পড়লে এ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, নেপাল তিব্বত সীমান্তের দুই দিকেই যৌথ উদ্ধার অভিযান চলছে। এ পর্যন্ত ১২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত অংশে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপাল কর্তৃপক্ষও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা নিশ্চিত করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ শেয়ার করা একটি হালনাগাদ তথ্যে নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড জানিয়েছে, তারা মোট ৩৮৪ জন পর্যটককে নিখোঁজ হিসেবে শনাক্ত করেছে। এদের মধ্যে ২৯১ জন বিদেশী নাগরিক এবং ৯৩ জন নেপালি নাগরিক। নিখোঁজ বিদেশীদের মধ্যে ১২ জন ব্রিটিশ নাগরিক, ১০৫ জন ভারতীয়, ৩৭ জন অনাবাসী ভারতীয় (এনআরআই), ১৭ জন মালয়েশীয়, ৪ জন দক্ষিণ আফ্রিকান, ৩ জন আমেরিকান, ১ জন অস্ট্রেলীয় এবং ১ জন ডাচ নাগরিক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া আরো ১১১ জন নিখোঁজের জাতীয়তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে জানান, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা যৌথভাবে উদ্ধারকাজে অংশ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, পাহাড়ি নদীর প্রচণ্ড স্রোত গ্রামগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।
বন্যা ও ভূমিধসের পর ভোটে কোশি নদীর ভাটিতে অবস্থিত একাধিক এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পুরো অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সড়কটি বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কাঠমান্ডুতে অবস্থানরত চীনা ব্যবসায়ী ই লিয়াং জানান, তাদের কোম্পানির সাতটি ট্রাক ওই এলাকায় আটকা পড়েছে, যার সবগুলোর কর্মীরাই নেপালি। সেখানে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমার জানা মতে, কোনো পূর্বাভাস দেয়া হয়নি। বিশেষ করে বর্ষাকালে সেখানে মাঝে মাঝে পাহাড় ধস হতো। কিন্তু এবারের ঘটনা অনেক বেশি মারাত্মক মনে হচ্ছে।
দুর্যোগের কারণে তিব্বত অংশও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেখানকার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো অস্পষ্ট। সিচুয়ান প্রদেশের বাসিন্দা গুয়ান দাওক্সুয়ানের জানিয়েছেন, বুধবার সকালে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়েছেন। তার স্ত্রী তিব্বতে সড়ক ও সেতু নির্মাণের কাজে নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। গুয়ান জানান, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নেপালি কর্তৃপক্ষ এলাকাটি পরিদর্শনের জন্য একটি হেলিকপ্টার পাঠানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রবল বাতাসের কারণে সেটি দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারছে না।
এদিকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে জরুরি বৈঠক করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ। তিনি জানান, রেড ক্রস ও স্কাউটসসহ স্থানীয় মেডিকেল টিমগুলোকে কাজে নামানো হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে পুলিশের ২৬ জন কর্মকর্তা, সশস্ত্র পুলিশের ৯ জন এবং ৪৪ জন সেনাসদস্য রয়েছেন।
অন্যদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিখোঁজদের উদ্ধারে সর্বাত্মক তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মাধ্যমিক দুর্যোগ এড়াতে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আগাম সতর্ক বার্তা চালুর তাগিদ দিয়েছেন তিনি। চীনা সরকারের পক্ষ থেকেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানোর জন্য উদ্ধারকারী দলকে তিব্বতে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
গত বছরও তিব্বত অংশের হিমবাহ গলে রসুইয়া এলাকায় আকস্মিক বন্যায় ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, এবারের দুর্যোগের তীব্রতা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি।















