ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর দেশটির ক্ষমতা কাঠামো, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শাসন ব্যবস্থা ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, নিরাপদ, সুষ্ঠু ও ন্যায়সংগত ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে। তবে এ ‘পরিচালনা’ কী ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে হবে, কতদিন চলবে, দেশটির অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের কী হবে সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা দেয়নি ট্রাম্প প্রশাসন। এমনকি দেশটির গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিষয়েও কোনো আলোচনা নেই। বরং ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলার জ্বালানি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করবে। ভেঙে পড়া অবকাঠামো পুনর্গঠন করা হবে এবং জ্বালানি উৎপাদন ও রাজস্ব বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বরাত দিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো বলছে, ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে একটি গ্রুপ কাজ করবে। যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। তবে ভেনিজুয়েলার সবচেয়ে প্রভাবশালী বিরোধী নেতা শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর সঙ্গে কাজের সম্ভাবনা প্রকাশ্যে নাকচ করে দিয়েছেন ট্রাম্প। তার দাবি, দেশের ভেতরে মাচাদোর যথেষ্ট সমর্থন নেই।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা গবেষক ম্যাক্স বুট বলেন, ‘ট্রাম্পের সামরিক অভিযানটি যতটা নিখুঁত ও সফল তার পরিকল্পনা ততটাই অস্পষ্ট।’ তার মূল্যায়ন অনুযায়ী, যদি আরো বৃহত্তর বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, তবে এটি হবে এমন এক উদাহরণ যেখানে সামরিক সাফল্য রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হবে। তিনি সতর্ক করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি দীর্ঘমেয়াদি অন্তর্বর্তী শাসনের পথে এগোয়, তবে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ভেনিজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের দায়িত্ব নেয়ার কথা। দেশটির সুপ্রিম কোর্টও তাকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। এরই মধ্যে দেলসি শপথও নিয়েছেন। তবে ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোয় সবচেয়ে আলোচিত নাম দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো। কিছু জেনারেল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা যাচাই করছেন—এমন খবর শোনা গেলেও কাবেলোপন্থী গোষ্ঠী এখনো আপসের পথে আগ্রহী নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ গবেষক শ্যানন কে ও’নিলের মতে, মাদুরোকে অপসারণ করা হলেও তার ঘনিষ্ঠরাই দেশটিতে বহাল। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে প্রশাসন পরিচালনা করা সহজ হবে না। এছাড়া গত দুই যুগে ভেনিজুয়েলার সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে। আনুগত্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। রাষ্ট্রক্ষমতা এখন কেবল সেনাবাহিনীর হাতে নয়, বরং সক্রিয় রয়েছে গোপন পুলিশ, মিলিশিয়া সংগঠন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান সামরিকভাবে সফল হলেও এর কৌশলগত ফলাফল কতটা ইতিবাচক হবে তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। অপারেশনে দেড়শর বেশি মার্কিন উড়োজাহাজ, বিশেষায়িত কমান্ডো ইউনিট অংশ নেয়। অভিযানকে নাটকীয় কায়দায় দ্রুততম অভিযান হিসেবে বর্ণনা করা হলেও অভিযান-পরবর্তী পরিকল্পনা কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণায় গণতান্ত্রিক রোডম্যাপের চেয়ে জ্বালানি খাত পুনর্গঠনের প্রতি বেশি জোর দেয়া হয়েছে—এমন মতও প্রকাশ করছেন নিরাপত্তা গবেষকরা। তাদের মতে, ভেনিজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনে বহু বছর লাগবে, নতুন আইনি কাঠামো ও বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যা কার্যত দীর্ঘমেয়াদি বিদেশী উপস্থিতির পথ তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা বাড়লে লাতিন আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলোকে নতুন করে অভিবাসনের চাপ মোকাবেলা করতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক রক্সানা ভিজিল মনে করেন, জ্বালানি শিল্প পুনর্গঠনে বহু বছর লাগবে, যা কার্যত দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন উপস্থিতির যুক্তি তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, ‘এটি এমন এক হস্তক্ষেপ, যার কেন্দ্রবিন্দু জ্বালানি; নির্বাচন নয়।’
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, ভেনিজুয়েলার মজুদে রয়েছে প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি। এ বিপুল জ্বালানিভাণ্ডার দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশটিতে জ্বালানি উৎপাদন গত এক দশকে মারাত্মকভাবে কমে গেছে। একসময় দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশটি বর্তমানে উৎপাদন করছে মাত্র ১০ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো ভেনিজুয়েলা থেকে সরে যায়। ফলে দেশটিতে নতুন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি পিডিভিএসএ দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, শেভরনের মতো বড় মার্কিন কোম্পানিগুলো সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ‘ভেঙে পড়া অবকাঠামো’ ঠিক করবে। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বড় প্রশ্ন হলো, ভেনিজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ যদি ট্রাম্পের কথা মানতে অস্বীকার করেন, তবে তিনি কীভাবে দেশটি চালাবেন? ‘কারডোজো স্কুল অব ল’র অধ্যাপক রেবেকা ইংবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভেনিজুয়েলা চালানোর কোনো আইনি পথ তিনি দেখছেন না। এটি আন্তর্জাতিক আইনে একটি অবৈধ দখলদারত্বের মতো শোনাচ্ছে এবং ঘরোয়া আইনেও প্রেসিডেন্টের এমন কিছু করার ক্ষমতা নেই।
অবশ্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ভেনিজুয়েলার বর্তমান নেতৃত্ব যদি ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ নেয়, তাহলে তাদের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে রুবিও বলেন, ‘আমরা তাদের মূল্যায়ন করব, তারা সামনে এগিয়ে কী করে তার ভিত্তিতে। এ মুহূর্তে তারা প্রকাশ্যে কী বলছে তার ওপর নয়, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে তারা কী করেছে তার ওপরও নয়, বরং তারা ভবিষ্যতে কী করে সেটার ওপর।’
রুবিও আরো বলেন, ‘আমি এটুকু জানি যে যদি তারা সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একাধিক উপায়ে প্রভাব খাটাবে।’ তার এ মন্তব্যে ইঙ্গিত স্পষ্ট, সব মিলিয়ে ভেনিজুয়েলার সামনে এখন যে বাস্তবতাটা দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম অনিশ্চয়তা।










