প্রিয় গির্জা সান্তা মারিয়া ম্যাজোরে ব্যাসিলিকায় অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন পোপ ফ্রান্সিস। গতকাল ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রার্থন সভা অনুষ্ঠানের পর পোপের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার মরদেহবাহী কফিন সমাধিস্থ করার জন্য ইতালির রোমের ওই গির্জায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি বিশেষ কক্ষের নিচে তাকে সমাহিত করা হয়। এক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম
কোনো পোপকে ভ্যাটিকানের বাইরে সমাহিত করা হলো।
গত ২১ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে মারা যান পোপ ফ্রান্সিস। ১২ বছর ধরে ক্যাথলিক চার্চের নেতৃত্বদানকারী পোপের শেষ বিদায়ে অংশ নেন বিশ্বের নানা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, রাজপরিবারের সদস্যসহ প্রায় চার লাখ শোকাহত মানুষ। খবর বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান।
সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ক্যাথলিক চার্চের কার্ডিনালদের সর্বোচ্চ পদ ডিন অব দ্য কলেজ অব কার্ডিনালস হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কার্ডিনাল জিওভান্নি বাতিস্তা রে। তিনি পোপের দয়া, শান্তি ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি স্মৃতিচারণে বলেন, ‘পোপ ফ্রান্সিস ছিলেন দয়ার প্রতীক, শান্তির বার্তাবাহক ও সৃষ্টির রক্ষক। পোপ সবার জন্য নিজের হৃদয় উন্মুক্ত রেখেছিলেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিনয়ী ও জনগণের সেবক হিসেবে ছিলেন।’
পোপ ফ্রান্সিসের কফিনটি ছিল সাধারণ কাঠের তৈরি, যার মধ্য দিয়ে তার বিনয়ী জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার বেদির সামনে তিনদিন রাখার পর ১৪ জন সাদা দস্তানা পরিহিত বাহক কফিনটি বাইরে নিয়ে আসেন। এ সময় সমবেত জনতা করতালিতে ফেটে পড়ে।
আয়োজনটিতে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, প্রিন্স উইলিয়ামসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আয়োজনের আগে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে আরো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ের মিলেই ও ইউরোপিয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। ঐতিহাসিক এ ঘটনার সাক্ষী হতে বিশ্বের দুই হাজারেরও বেশি সাংবাদিক রোমে উপস্থিত হন। সব মিলিয়ে আয়োজনটি পরিচালনা করেন ২২০ জন কার্ডিনাল, ৭৫০ জন বিশপ ও চার হাজারের বেশি যাজক।
কার্ডিনাল বাতিস্তা রে বলেন, ‘গত কয়েক দিনে মানুষ যে ভালোবাসা দেখিয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায়, পোপ ফ্রান্সিস মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন।’
ইতালীয় তীর্থযাত্রী রোসা সিরিয়েলি বলেন, ‘পোপ ফ্রান্সিস যখন বেঁচে ছিলেন, তিনি আমাদের আশার আলো দেখিয়েছিলেন। এখন মনে হচ্ছে বিশাল এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। তিনি এমন এক সময়ে চলে গেলেন যখন বিশ্ব কঠিন সময় পার করছে।’
পোপের অন্তিম যাত্রা শুরু হয় ভ্যাটিকান থেকে বিশেষভাবে সাজানো পপমোবাইলে করে। মোটরবাইকে পুলিশি পাহারায় তার কফিন রোমের মধ্য দিয়ে টাইবার নদীর সেতু, পিয়াজ্জা ভেনেজিয়া, রোমান ফোরাম ও কলোসিয়ামের পাশ কাটিয়ে সান্তা মারিয়া ম্যাজোরে ব্যাসিলিকায় পৌঁছায়। এটি পোপ ফ্রান্সিসের প্রিয় গির্জা ছিল, যেখানে তিনি প্রায়ই প্রার্থনা করতেন।
সান্তা মারিয়া ম্যাজোরে ব্যাসিলিকার সিঁড়িতে অপেক্ষা করছিল ৪০ জনের একটি বিশেষ দল, যার মধ্যে ছিলের কয়েকজন বন্দি, শরণার্থী, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি ও গৃহহীন মানুষ। তাদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় তার শেষ বিদায়। ভ্যাটিকানের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সমাধিস্থ করার সময় তার ঘনিষ্ঠরা শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পান।
তার কফিন রাখা হয়েছে সান্তা মারিয়া ম্যাজোর গির্জার একটি সাধারণ স্থানে, যেখানে আগে শুধু মোমবাতি ও ফুল রাখা হতো। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, সমাধিতে কোনো শোভা বা অলংকরণ করা হয়নি, শুধু লাতিন ভাষায় লেখা রয়েছে ‘Franciscus’।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্যাথলিক বিশ্বে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শনিবার শুরু হয়েছে নয় দিনব্যাপী শোক পালন। নতুন পোপ নির্বাচনের জন্য গোপন বৈঠক (কনক্লেভ) শুরু হবে আগামী ৫ মে। এখন পর্যন্ত ফিলিপাইনের রিফর্মার লুইস আন্তোনিও টাগলে ও ইতালির পিয়েত্রো প্যারোলিনের নাম শীর্ষে রয়েছে।
ইতালির নাপোলি থেকে আসা দম্পতি ভার্জিনিও ও আন্না মারিয়া বলেন, ‘আমরা চাই নতুন পোপ যেন ফ্রান্সিসের পথ অনুসরণ করেন।’
পোপ ফ্রান্সিস আর্জেন্টিনার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি প্রায় ১৩ শতক পর প্রথম অ-ইউরোপীয় পোপ হন। ১২ বছরের নেতৃত্বে তিনি পরিবেশ রক্ষা, দরিদ্র মানুষের অধিকার ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। বিশ্ববাসীর কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন সহানুভূতিশীল ও বিনয়ী নেতার প্রতিচ্ছবি।










