এক সময় ভারতের অন্যতম সেরা উদ্ভাবক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রশংসিত ছিলেন সোনম ওয়াংচুক। জনপ্রিয় বলিউড চলচ্চিত্র 'থ্রি ইডিয়টস'-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ফুংসুখ ওয়াংডু বা র্যাঞ্চো সৃষ্টির অনুপ্রেরণা তিনি। সেই ওয়াংচুকই এখন 'রাষ্ট্রদ্রোহী' কার্যকলাপের অভিযোগে রাজস্থানের এক কারাগারে বন্দি। লাদাখের সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতে তার নেতৃত্বাধীন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সাম্প্রতিক সহিংসতায় মোড় নেয়ায় ভারত সরকার তাকে আটক করেছে।
১৯৬৬ সালে লাদাখের উলেটোকপো গ্রামে জন্ম সোনম ওয়াংচুকের। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে তিনি ‘সেকমল’ নামে বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে ব্যর্থ ছাত্ররাও শিখত সফলতার নতুন সংজ্ঞা। তিনি আবিষ্কার করেন ‘আইস স্টূপা’ বা কৃত্রিম হিমবাহ, যা পাহাড়ি এলাকায় পানি সংরক্ষণে সাহায্য করে। ভারতের সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি করেছিলেন সৌরচালিত তাঁবুও। ২০১৮ সালে তিনি ম্যাগসেসে পুরস্কার পান। তার কাজ থেকেই থ্রি ইডিয়টস ছবির ‘ফুংসুখ ওয়াংডু’ চরিত্রের জন্ম।
২০১৯ সালের আগস্টে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে লাদাখকে আলাদা করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করার সিদ্ধান্তকে ওয়াংচুক স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে লাদাখে আইন প্রণয়নের জন্য কোনো নির্বাচিত পরিষদ না থাকায় তিনি হতাশ হন এবং স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও উপজাতিদের সুরক্ষার জন্য সংবিধানের 'ষষ্ঠ তফসিল'-এর অধীনে লাদাখকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে প্রতিবাদ শুরু করেন। লাদাখের ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ আদিবাসী উপজাতি।
লাদাখের রাজধানী লেহ-তে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়াংচুকের নেতৃত্বে ১৫ দিনের শান্তিপূর্ণ অনশন চলাকালে একদল বিক্ষুব্ধ যুবক শাসক দল বিজেপির স্থানীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে চার বিক্ষোভকারী নিহত এবং অনেকে আহত হওয়ার পর পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ২৬ সেপ্টেম্বর ওয়াংচুককে গ্রেফতার করে প্রায় এক হাজার মাইল দূরে রাজস্থানের যোধপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেয়া এবং সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের মতো 'জাতীয় নিরাপত্তা আইন'-এর মতো কঠোর ধারায় মামলা করা হয়েছে। এই আইনে বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত আটক রাখা যায়।
এক সময় বিজেপি সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই প্রচারণায় ওয়াংচুককে ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন সেই সরকারই তাকে 'রাষ্ট্রবিরোধী' বলে আখ্যায়িত করে তার আন্দোলনের পেছনে পাকিস্তানের হাত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো এই অভিযোগকে 'মিথ্যা ও ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, এটি তার স্বামীর মুখ বন্ধ করানোর চেষ্টা।
গ্রেফতারের পর ওয়াংচুকের ভক্ত স্থানীয় ব্যবসায়ী স্তানজিন দোর্জে আত্মহত্যা করেছেন। ওয়াংচুকের অনশনে যোগ দিয়েছিলেন দোর্জে। তার আত্মহননে লেহতে বিরাজ করছে ক্ষোভ ও শোকের ছায়া।
ওয়াংচুকের গ্রেফতারের পর স্থানীয় প্রতিবাদী দলগুলো সরকারের সঙ্গে আলোচনা থেকে সরে এসেছে। তারা অবিলম্বে ওয়াংচুকসহ অন্যান্য বন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহতদের ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, দাবি মানা না হলে আরো বড় আন্দোলন হবে।
ওয়াংচুক এবং তার সমর্থকরা বলছেন, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে আলাদা হওয়ার পর লাদাখ এখন ‘কড়াই থেকে আগুনে’ পড়েছে। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে লাদাখের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি রক্ষার জন্যই ছিল সে আন্দোলন।










