রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতকে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি তেল সরবরাহ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল নয়াদিল্লির রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হায়দরাবাদ হাউজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পুতিন এ ঘোষণা দেন। ভারত যাতে রাশিয়া থেকে তেল না কেনে তার জন্য দিল্লির ওপর যুক্তরাষ্ট্র যখন চাপ দিচ্ছে, তার মধ্যেই পুতিন এ ঘোষণা দিলেন। ভারতকে তাদের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়তে মস্কো সহায়তা দিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন পুতিন। এর আগে তারা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে দুই নেতার সামনেই সংবাদ সম্মেলনে একাধিক সমঝোতাপত্র বিনিময় করেন ভারত ও রাশিয়ার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। যার বেশির ভাগই বাণিজ্যসংক্রান্ত। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জাহাজ নির্মাণ, মেরু অঞ্চলের সমুদ্রে কাজ করার জন্য ভারতীয় নাবিকদের প্রশিক্ষণ, নতুন জাহাজপথ গড়ে তুলতে বিনিয়োগ, বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমঝোতা।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ভ্লাদিমির পুতিন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলেন, ‘টেলিফোনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমাদের (মোদির সঙ্গে) মধ্যে কথা হয়। রাশিয়া আর ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যথেষ্ট মজবুত। আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক অর্থনৈতিক বিষয়সহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে আরো মজবুত হচ্ছে। আমাদের মধ্যে বাণিজ্য এখন রুবল আর ভারতীয় রুপিতে চলছে। আমরা মেক ইন ইন্ডিয়া পরিকল্পনাকে সহযোগিতা করব। লজিস্টিক রুট গড়ে তোলার জন্য দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। আমরা ভারত মহাসাগরের রুট নিয়ে কথা চালাচ্ছি।’ বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে পুতিন বলেন, ‘মস্কো ভারতকে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দিতে প্রস্তুত।’
এছাড়া ভারত যে বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা নিয়েছে, তাতেও রাশিয়া সহযোগিতা করছে বলে জানান পুতিন। তামিলনাড়ুর কুদানকুলামে ভারতের এ বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি গড়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘ছয়টির মধ্যে দুটি ইউনিট এরই মধ্যে বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে, বাকি চারটি নির্মীয়মাণ অবস্থায় আছে। পুরোপুরি কাজ শুরু করলে এটি ভারতের সাধ্যের মধ্যে বিদ্যুতের যে চাহিদা আছে, তাতে একটা বড় অবদান রাখবে। আমরা ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টর, ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ওষুধ ও কৃষি শিল্পের জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেন, ‘পুতিন শুধু ভারতের ঘনিষ্ঠ অংশীদারই নন, আমার প্রিয় বন্ধুও বটে।’ মোদি স্মরণ করিয়ে দেন, চলতি বছরের এপ্রিলে কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার সময় দৃঢ়ভাবে ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল রাশিয়া। মস্কো সে সময় বলেছিল, তারা সন্ত্রাসবাদ দমনে ভারতের সঙ্গে একমত ও সব ধরনের সন্ত্রাস নির্মূলে পাশে আছে। রাশিয়া পাকিস্তানে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুরের’ পক্ষেও জোরালো সমর্থন জানিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘গত আট দশকে বিশ্ব বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। নানা মানবিক সংকট ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি আমরা। এর মধ্যেও ভারত-রাশিয়ার বন্ধুত্ব অটুট থেকেছে। পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এ সম্পর্ক সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।’
তবে পুতিনের জ্বালানি তেল সরবরাহের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি মোদি। বরং পারমাণবিক ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সহযোগিতাকে সামনে আনেন। তিনি বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা ভারত-রাশিয়া অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
বহুদিন ধরে বেসামরিক পারমাণবিক খাতের সহযোগিতা আমাদের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করেছে। এ সহযোগিতা চলবে।’
ভারত-রাশিয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে নতুন প্রোগ্রামে যোগ দেয়ার কথা জানিয়ে মোদি বলেন, ‘ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিই আমাদের অগ্রাধিকার। তার জন্যই ২০৩০ সাল পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছি আমরা।’ ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে মোদি জানান, ভারত নিরপেক্ষ নয়, শান্তির পক্ষে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রথম থেকেই দিল্লি জানিয়ে এসেছিল, ভারত শান্তির পক্ষে। মোদির কথায়, সাম্প্রতিক সময়ে যতটা চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে আমি নিশ্চিত, বিশ্ব ফের শান্তির দিশা খুঁজে পাবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছান। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এটিই ছির তার প্রথম ভারত সফর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রটোকল ভেঙে তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যান। এ সময় দুই নেতা করমর্দন, আলিঙ্গন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন এবং এরপর তারা একই গাড়িতে বিমানবন্দর ছাড়েন। পরে গতকাল দুই নেতার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও বাণিজ্যই ছিল শীর্ষ বৈঠকের মূল বিষয়। সফর শেষে গতকাল রাতেই ভারত সফর শেষে মস্কোর উদ্দেশে রওয়ানা দেন পুতিন।










