১৯৩০-এর দশকে উত্তর ইরাকে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের তোলা ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের অনেক সাদা-কালো ছবি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের আর্কাইভ থেকে উদ্ধার হয়েছে। প্রায় ৩০০ ছবির এ ভাণ্ডারে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থান, দৈনন্দিন জীবনধারা ও বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠান ধরা আছে। ইতিহাসের এ উপাদানের প্রায় সবই আইএসের হাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ছবি শুধু স্মৃতি নয়, বরং আইএসের ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্ত প্রতীক।

১৯৩০-এর দশকে উত্তর ইরাকে প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে গবেষণা করতে যাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিকরা স্থানীয় ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। তারা ইয়াজিদিদের দৈনন্দিন জীবনের অনেক ছবি তোলেন। ছবিগুলো পরবর্তী সময়ে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরের আর্কাইভে চলে যায়। তবে সেগুলো আলাদাভাবে না থেকে আর্কাইভে সংরক্ষিত প্রায় দুই হাজার ছবির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

২০২২ সালে পিএইচডি শিক্ষার্থী মার্ক মারিন ওয়েব একটি ইয়াজিদি মাজারের ছবি আবিষ্কার করেন, যেটি আইএস ধ্বংস করেছিল প্রায় এক দশক আগে। পরে তিনি ও আরো গবেষক মিলে প্রায় ৩০০ ছবি একত্র করেন। ছবিগুলো ইয়াজিদিদের জীবন, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের এক ভিজুয়াল আর্কাইভের গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার।

গবেষকরা এগুলো নিয়ে ডিজিটাল আর্কাইভ ও প্রদর্শনীর আয়োজন করছেন। এর মাধ্যমে প্রবাসী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের কাছে হারানো ইতিহাস ফেরত দেয়া হচ্ছে। আর্কাইভে পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ডে থাকা আনসাম বাশার নামে এক শিক্ষক নিজের দাদা-দাদির বিয়ের ছবি দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কেউ কল্পনাও করতে পারে না আমার বয়সী একজন মানুষ আইএস হামলার কারণে নিজের ইতিহাস হারিয়ে ফেলতে পারে। আমার অ্যালবাম, শৈশবের ছবি, ভিডিও, দুই ভাইয়ের বিয়ের ভিডিও সবই হারিয়ে গেছে। এখন হঠাৎ দাদা-দাদির ছবি আবার জীবন্ত হয়ে উঠল, এটা ভীষণ আনন্দের।’

তার দাদা বাশির সাদিক রশিদ আল-রশিদানি ছিলেন প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য, যিনি প্রায়ই প্রত্নতাত্ত্বিক দলকে তার ক্যাফেতে আপ্যায়ন করতেন। তিনি অন্যদের মতো গবেষকদের সঙ্গে খননকাজে যুক্ত ছিলেন। তাই তিনি পশ্চিমা গবেষকদের নিজের বিয়েতে আমন্ত্রণ জানান। তারা বিয়েতে ছবি তোলেন।

উল্লেখ্য, ইয়াজিদিরা ইরাকের প্রাচীনতম ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অন্যতম। তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সাস্কৃতিক ঐহিত্য ও জীবনধারা রয়েছে। আইএসের হামলায় হাজারো ইয়াজিদি নিহত হয়। অনেকে দেশছাড়া হয়, অনেক নারী যৌনদাসী হয়ে পড়ে। তাদের বহু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে ছোট এ সম্প্রদায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

মারিন ওয়েব কানাডার ডকুমেন্টারিয়ান নাথানিয়েল ব্রান্টের সঙ্গে মিলে খুঁজে পাওয়া ছবিগুলো প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এ প্রদর্শনী ইয়াজিদি প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল মাধ্যমেও করা হবে। নাথানিয়েল ব্রান্ট বলেন, ‘আইএস যখন সিনজারে আসে, তারা ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলো ধ্বংস করে দেয়। তাই এসব ছবি আসলে ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধের প্রতীক।’ সূত্র: এপি