বিদায় নিয়েছে ২০২৫ সাল। বিদায়ী বছরের পুরো সময়জুড়ে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং দেশে দেশে নীতিগত অনিশ্চয়তা। বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজারকে চাপে রেখেছে মার্কিন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ, সুদহার নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে মতভেদ ও ডলারের দুর্বলতা। এরপরও ২০২৫ সালে আট বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ উত্থান দেখেছে এশিয়ার শেয়ারবাজার। এক্ষেত্রে প্রধান প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) প্রযুক্তি ও চিপ খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরের উত্থান। খবর রয়টার্স।
এ সময় বিশ্বজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগ ব্যাপক মাত্রায় বাড়তে দেখা গেছে। আবার একই সঙ্গে নিরাপদ ও আপৎকালীন সম্পদেও বিনিয়োগ বাড়িয়ে গেছেন বিনিয়োগকারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় স্বর্ণ ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এআই খাত থেকে পাওয়া রিটার্ন কতটুকু টেকসই হতে পারে, এটিই হবে নতুন বছরে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের সবচয়ে বড় প্রশ্ন। পাশাপাশি মুদ্রানীতির গতিপথ এবং শুল্কনীতির বিলম্বিত প্রভাবের দিকেও সতর্ক মনোযোগ থাকবে বাজারসংশ্লিষ্টদের।
জাপানের শেয়ারবাজারকে বাদ দিয়ে হিসাব করা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বিস্তৃত শেয়ার সূচক এমএসসিআই গতকাল দশমিক ১৭ শতাংশ কমেছে। আর বছরজুড়ে সূচকটি বেড়েছে ২৭ শতাংশ, যা ২০১৭ সালের পর সর্বোচ্চ। এ ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে এআই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারমূল্যের ব্যাপক উত্থান।
বছরের শেষ দিনের লেনদেনে গতকাল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ারবাজার ছিল কিছুটা স্থিতিশীল। চলতি সপ্তাহে জাপানের শেয়ারবাজারে আর কোনো আনুষ্ঠানিক লেনদেন হবে না। নববর্ষের ছুটি থাকায় অধিকাংশ বাজারেই আজ লেনদেন থাকবে বন্ধ। যেগুলো খোলা থাকবে, সেগুলো লেনদেনের পরিমাণ কম হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। এতে দামের ওঠানামাও থাকবে সীমিত।
চীনের ব্লু-চিপ সূচক গতকাল সামান্য বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে সূচকটি বছরজুড়ে বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক গতকাল দশমিক ৯ শতাংশ কমলেও ২০২৫ সালে এটি বেড়েছে রেকর্ড ২৮ শতাংশ। হংকংয়ের বাজারে এবার বাণিজ্য ও শুল্ক বিবাদসৃষ্ট উদ্বেগের প্রভাব ছিল খুব কম।
তবে ২০২৫ সালে গোটা বিশ্বে সবচেয়ে বড় উত্থানের দেখা পেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক। গত বছর সূচকটি বেড়েছে ৭৬ শতাংশ। এতে বড় ভূমিকা রেখেছে এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাংয়ের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টদের শেয়ারদরের উল্লম্ফন।
ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক কাইল রোডা বলেন, ‘কিছু ছোটখাটো ধাক্কা সত্ত্বেও বিনিয়োগ রিটার্নের দিক থেকে ২০২৫ সাল ছিল অসাধারণ।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি সত্যি যে মুনাফা কিছুটা কেন্দ্রীভূত ছিল। তবে এআই বুম এবং শিথিল মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বিত প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের দাম বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।’
শুল্কযুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড দীর্ঘ ফেডারেল শাটডাউন, তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বছরজুড়েই জারি ছিল। এসব বিষয় আর্থিক বাজারের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তা সত্ত্বেও বছরজুড়ে বাজারগুলো ভালো মুনাফা দিতে সক্ষম হয়েছে।
সিঙ্গাপুরের স্যাক্সো ব্যাংকের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চনানা বলেন, ‘২০২৬ সালের শুরুতেও আর্থিক বাজারের প্রধান প্রভাবক হয়ে থাকবে এআই। তবে এর ধরন পাল্টাবে। বাজারে উচ্ছ্বাস থাকবে কম। এআইয়ের আরো বেশি বাস্তব প্রয়োগ এবং বিনিয়োগ থেকে প্রকৃত রিটার্ন আসছে কিনা সেদিকেই নজর থাকবে বিনিয়োগকারীদের।’
সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এআই ও মূল্যবান ধাতু দুটির (স্বর্ণ ও রূপা) ক্ষেত্রেই অত্যধিক বিনিয়োগের প্রবাহ হঠাৎ উল্টো দিকে ঘুরে যেতে পারে।’
চারু চনানা আরো যোগ করেন, ‘নতুন বছরে সুদহার পরিবর্তন নিয়ে বিনিয়োগকারীরা খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকবেন। এতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০২৫ সালে পুরোপুরি স্পষ্ট না হওয়া শুল্কনীতির বাস্তব অর্থনৈতিক প্রভাব ২০২৬ সালে সামনে আসতে শুরু করলে দ্রুত মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা ও মুনাফার মার্জিন পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে।’
বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহের বড় বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) ডিসেম্বর সভার কার্যবিবরণী। এতে সুদহার নিয়ে মার্কিন মুদ্রানীতির শীর্ষ নির্ধারকদের মধ্যকার গভীর মতভেদ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ডিসেম্বরের শুরুতে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাত্র এক দফা সুদহার কমানোর ইঙ্গিত দিলেও ট্রেডাররা এ বছর অন্তত আরো দুই দফা সুদহার কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধরে নিচ্ছেন।
ফেডের ডিসেম্বরের সভার কার্যবিবরণীতেও এ-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এতে দেখা যায়, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। আবার কিছু নীতিনির্ধারক যুক্তি দিয়েছেন, ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ রেখে পদক্ষেপ নেয়া উচিত। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির গতি কমে গেছে। এ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, যা শ্রমবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।
জাপানে ছুটির কারণে গতকাল নগদ ট্রেজারি বন্ডে লেনদেন হয়নি, আর ট্রেজারি ফিউচারেও তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি নোটের ইল্ড ছিল ৪ দশমিক ১২৫৮ শতাংশ, যা চলতি বছরে মোট ৪৫ বেসিস পয়েন্ট কমেছে।
মুদ্রাবাজারে গতকাল ডলারের বিনিময় হার ছিল মোটামুটি স্থিতিশীল। পুরো বছরে মুদ্রাটির অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যা ২০১৭ সালের পর এক বছরে সবচেয়ে বড় পতন। এর বিপরীতে ইউরো ও পাউন্ড স্টার্লিং বছরজুড়ে আরো শক্তিশালী হয়েছে।










