হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনী ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল—এমন অভিযোগে ইরানি ড্রোন লক্ষ্য করে নতুন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরই কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি করে হামলা চালায় তেহরান। খবর রয়টার্স।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, মার্কিন বাহিনী ইরানের চারটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বন্দর আব্বাসের একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশনেও হামলা চালায়, এখান থেকে পঞ্চম ড্রোনটি উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি চলছিল।
গত মাসের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছিল। এর মাঝে গত কয়েকদিনে একটি দ্বিতীয় মার্কিন হামলা।
গতকালের হামলা সম্পর্কে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ পদক্ষেপগুলো পরিমিত, পুরোপুরি প্রতিরক্ষামূলক এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার উদ্দেশ্যে নেয়া।’
অন্যদিকে এক সামরিক সূত্রের বরাতে দিয়ে ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা মার্কিন জ্বালানি তেলবাহী একটি ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস নেভি। এতে জাহাজটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী বন্দর আব্বাসের আশপাশের খোলা এলাকায় হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়। তবে এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেও জানানো হয়।
পরে ইরানি গণমাধ্যমে বলা হয়, আজ ভোরে চারটি জাহাজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়ে সেগুলোকে ফিরিয়ে দেয়া হয়।
এর আগে সোমবার দক্ষিণ ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ওই হামলাকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বললেও তেহরান একে যুদ্ধবিরতির ‘চরম লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করে।
গতকাল ওয়াশিংটনে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কোনো একক দেশের হাতে যাবে না। তিনি ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় ওমানকেও হুঁশিয়ারি দেন।
দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে সম্পর্কিত ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প বলেন, ‘কেউ (হরমুজ) নিয়ন্ত্রণ করবে না। এটা আন্তর্জাতিক জলসীমা। ওমান অন্য সবার মতো আচরণ করবে, না হলে আমাদের ওদের উড়িয়ে দিতে হবে। তারা সেটা বোঝে।’
এদিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল তদারকির জন্য গঠিত ইরানের ‘পারসিয়ান গালফ স্ট্রেইট অথরিটি’-কে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করেছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় টিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের আশপাশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্য ও নতুন মার্কিন সামরিক পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়েছে—যুদ্ধ অবসানের প্রশ্নে দুই দেশ এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তিন মাসের যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের দামও তীব্রভাবে বেড়েছে।
ইরানি টিভি বলেছে, সম্ভাব্য চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের আশপাশ থেকে সামরিক বাহিনী সরিয়ে নিতে হবে। যদিও অঞ্চলটিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতির প্রশ্নে আরো আলোচনা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকর রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইনের ঘাঁটিসহ পুরো অঞ্চলে আরো কয়েক হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজও নিয়মিত এই অঞ্চলে টহল দিচ্ছে।
ইরানি প্রতিবেদনে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বিলুপ্ত হোক। তবে তেহরান বলছে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘মূল বিষয় হলো—ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।’
এদিকে ইরানের আইআরজিসি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, স্থানীয় সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে তারা একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
যদিও তারা বিমানঘাঁটির অবস্থান জানায়নি, তবে এর পরপরই কুয়েত ঘোষণা দেয় যে ‘শত্রুভাবাপন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকি’ প্রতিহত করছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, দেশজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেলেও সেগুলো মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করার ফল।
আইআরজিসি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়ে যায়।
আজ প্রারম্ভিক লেনদেনে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৭২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭ ডলার ৮০ সেন্ট। অন্যদিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেড়ে ৯১ ডলার ৯৯ সেন্টে পৌঁছায়।
এর আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য সমঝোতার আশায় বাজারে দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে এক মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল।










