একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন অ্যানা। তিনি যুদ্ধ করছেন, তাও আবার নিজের দেশের মানুষের সঙ্গে! তবে যুদ্ধটা স্বেচ্ছায় করছেন না। তাকে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রতিরাতে এমন দুঃস্বপ্ন দেখে তিন-চারবার ঘুম ভাঙে ২০ বছর বয়সী অ্যানার। তরুণী অ্যানা সিএনএনকে বলেন, ‘আমি মিয়ানমার থেকে পালানোর উপায় খুঁজছি। মনে হয় না আমি এখানে থাকতে পারব।’
অ্যানার এ দুঃস্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হতে যাচ্ছে মিয়ানমারের হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর জীবনে। কারণ জান্তা সরকার সম্প্রতি দেশটির প্রাপ্তবয়স্কদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক করেছে।
রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের তিন বছর পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে কারণে সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করে তারা সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে চাইছে। আইন অনুযায়ী, ১৮-৩৫ বছর বয়সী সব পুরুষ ও ১৮-২৭ বছর বয়সী সব নারীকে অবশ্যই দুই বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করতে হবে। আর যেসব চিকিৎসক ও বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের বয়স ৪৫ বছরের মধ্যে, তাদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে তিন বছর থাকতে হবে। চলমান রাষ্ট্রীয় জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় এ নিয়োগ পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে বলেও জানিয়েছে জান্তা সরকার। সেই সঙ্গে নিয়োগ এড়ানোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে তিন থেকে পাঁচ বছরের জেল ও জরিমানা।
এ ঘোষণার পর পরই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে তরুণদের মধ্যে। ফলে দেশত্যাগের কথা ভাবছেন মিয়ানমারের তরুণরা। এমনকি দেশত্যাগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অবৈধ পথ অবলম্বন করবেন বলেও সিএনএনকে জানান কেউ কেউ।
ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে মাত্র দেড় লাখ কর্মী রয়েছে, যার মধ্যে যোদ্ধা সৈন্য রয়েছে ৭০ হাজার। গত তিন বছর নানা সংঘাত-সংঘর্ষে প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য হারিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। যে কারণে একটি যোদ্ধাবাহিনী হিসেবে নিজেদের সক্ষমতা হারিয়েছে তারা। সে ঘাটতি পূরণেই বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে সিএনএন মিয়ানমারের যেসব তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের চোখে ভীতির ছাপ স্পষ্ট। তারা ভয় পাচ্ছেন যে কোনো রকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাহাড়-জঙ্গলে তাদের সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হবে। সেই সঙ্গে তাদের বাধ্য করা হবে নিজের দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমার থেকে পালানোর কথা ভাবছেন দেশটির তরুণরা। এক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ প্রতিবেশী রাষ্ট্র থাইল্যান্ড।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৯ ফেব্রুয়ারি সিএনএনকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় থাই ভিসার জন্য আবেদনকারীদের মধ্যে মিয়ানমারের নাগরিকের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিদিন ৪০০ ওয়াক-ইন আবেদনকারীদের জন্য টোকেন সিস্টেম চালু করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করায় অপহরণ ও গ্রেফতারের অভিযোগও উঠেছে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, এর মধ্যেই কোনো সরকারি ব্যাখ্যা ছাড়া পশ্চিম রাখাইন রাজ্যের বিমানবন্দরগুলোয় যুবকদের গ্রেফতার, সামরিক যানবাহনে লোকজনকে তুলে নেয়া ও কয়েক ডজন আটক করা হয়েছে।
সামরিক জান্তা বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলো যুবকদের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য নিয়োগ করছে বা পথচারীদের গ্রেফতার করছে এমন খবর সঠিক নয়। এটাকে ‘দুষ্ট মিডিয়া নেটওয়ার্ক’ দ্বারা ছড়িয়ে দেয়া ‘ভুল তথ্য’ বলে অভিহিত করেছে জান্তা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জোরপূর্বক সেনাসদস্য নিয়োগের এ সিদ্ধান্ত মিয়ানমারের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। কারণ এর লক্ষ্য শুধু সৈন্য সংখ্যা বাড়ানো নয় বরং গণতান্ত্রিক প্রতিরোধ আন্দোলনকে ভেঙে ফেলাই এর মূল উদ্দেশ্য। তাছাড়া এ আইন দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অপরাধকে বিকাশের অনুমতি দেবে। একপর্যায়ে এটি দেশের ধ্বংস ডেকে আনবে।










