ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযানে ধ্বংস হতে চলেছে লেবাননের হাজার বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর মধ্যে রয়েছে ফিনিশীয় সভ্যতার প্রাচীন মন্দির থেকে শুরু করে ক্রুসেডারদের তৈরি দুর্গ।
তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চললেও গত শনিবার ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ৯০০ বছরের পুরোনো ‘বাফোর্ট দুর্গ’ দখল করে নেয়। বেশ কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর দুর্গটি নিয়ন্ত্রণে নেয় ইসরায়েলি সেনারা, যা গত ২৬ বছরের মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে ইসরায়েলের সবচেয়ে গভীরতম সামরিক অনুপ্রবেশ। এরই মধ্যে ইসরায়েলি সৈন্যরা লিতানি নদীর উত্তর অংশ পার হয়ে জাহরানি নদীর দিকে অগ্রসর হয়েছে।

ঝুঁকিতে লেবাননের ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট
লেবাননে বর্তমানে ছয়টি ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। মানবতার জন্য ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক বা প্রাকৃতিক গুরুত্বের কারণে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য ইউনেস্কো এ স্থানগুলোকে তালিকাভুক্ত করে।
দেশটির সংস্কৃতি মন্ত্রী ঘাসান সালামে জানিয়েছেন, দেশের দক্ষিণে ইসরায়েলি হামলা প্রাচীন টায়ার শহরসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থানকে বিপদের মুখে ফেলেছে। বৈরুত থেকে প্রায় ৮৩ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এ টায়ার শহরে প্রাচীন ফিনিশীয় সত্যতার গুরুত্বপূর্ণ ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে রোমান যুগের বিস্তৃত ধ্বংসাবশেষ ও রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বৃহত্তম হিপোড্রোম (ঘোড়দৌড়ের মাঠ)।
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রাচীন টায়ার শহর এক সময় ভূমধ্যসাগরের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক পরাশক্তি হয়ে উঠেছিল। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ অব্দে আলেকজান্ডারের অবরোধের পর দ্বীপ শহরটি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর গ্রিক, রোমান ও বাইজেন্টাইন শাসনামলে এর ব্যাপক সমৃদ্ধি ঘটে এবং ক্রুসেডের পরবর্তী শতাব্দীগুলোয় ধীরে ধীরে এর পতন শুরু হয়।

বাফোর্ট দুর্গ
হুমকিতে থাকা উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থানসমূহ:
- বাফোর্ট দুর্গ: আরবিতে এটি ‘কালাআত আল-শাকিফ’ নামে পরিচিত। দ্বাদশ শতাব্দীর এ ক্রুসেডার দুর্গ দক্ষিণ লেবাননের মূলভূখণ্ড থেকে ৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। লিতানি নদীর তীরে কৌশলগত অবস্থানের কারণে এটি অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। ক্রুসেডারদের পর অটোমানসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির হাতে এর নিয়ন্ত্রণ যায়। পরবর্তীতে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা এটিকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ১৯৮২ সালে আক্রমণের সময় ইসরায়েল এটি দখল করে এবং ২০০০ সালে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করার আগ পর্যন্ত এটি তাদের দখলেই ছিল।
- মাউন্ট আমেল অঞ্চলের চার মধ্যযুগীয় দুর্গ: কালাআত তিবনিন (তোরন), কালাআত চাকরা (দুবিয়াহ), কালাআত দেইর কিফা (মারন) এবং কালাআত চামা— এ চার দুর্গ দক্ষিণ লেবাননের সামরিক স্থাপত্যের বিবর্তনের সাক্ষী। দ্বাদশ শতাব্দীতে ক্রুসেডারদের ঘাঁটি হিসেবে শুরু হওয়া এ দুর্গগুলো কয়েক শতাব্দী ধরে আইয়ুবীয়, মামলুক ও স্থানীয় শাসকদের হাতে বারবার ব্যবহৃত ও পুনর্নির্মাণ হয়েছে। তিবনিন ও চামা দুর্গে ব্রোঞ্জ যুগের বসতির প্রমাণসহ রোমান এবং তার আগের প্রত্নতাত্ত্বিক স্তর সংরক্ষিত রয়েছে।

এশমুন মন্দির
- এশমুন মন্দির: সিডনের কাছে আওয়ালি নদীর তীরে ৩ দশমিক ৬ হেক্টরেরও বেশি (প্রায় ৯ একর) জায়গাজুড়ে পবিত্র স্থানটি অবস্থিত। ফিনিশীয় নিরাময়কারী দেবতা ‘এশমুন’র উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত মন্দিরটি প্রাচীন অঞ্চলের অন্যতম প্রধান চিকিৎসা ও নিরাময় কেন্দ্র ছিল।
- সাইদার ঐতিহাসিক কেন্দ্র: বৈরুত থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে সিডন ছিল ফিনিশীয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান বন্দর। ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য, কাচশিল্প ও ধাতুর কাজের ওপর ভিত্তি করে এ শহর সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এর ঐতিহাসিক কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ঢিবি বা টেল, মাছ ধরার বন্দর এবং জল ও স্থলের দুটি দুর্গ।
- চিম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান: লেবাননের চৌফ অঞ্চলে একটি প্রাচীন রোমান ও বাইজেন্টাইন গ্রামের ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষিত রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রাচীন ঘরবাড়ি, সূর্য দেবতা হেলিওসের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত একটি মন্দির এবং একটি বাইজেন্টাইন ব্যাসিলিকা (খ্রিস্টান উপাসনালয়)। এটি প্রাচীনকালের গ্রামীণ জীবন ও উপাসনার এক বিরল নিদর্শন।
- চেহাবি দুর্গ: দক্ষিণ লেবাননের হাসবাইয়াহ অঞ্চলের দিকে মুখ করে থাকা এ দূর্গ মূলত একটি ক্রুসেডার ঘাঁটি ছিল। দ্বাদশ শতাব্দীতে চেহাব আমিররা এটি দখল করেন এবং পরবর্তীতে এটি তাদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দুর্গের কিছু অংশে আজও তাদের বংশধরেরা বসবাস করছেন।
- কাবর হিরাম বা হিরামের সমাধি: টায়ার শহরের কাছে অবস্থিত এ বিশাল পাথুরে সমাধি ঐতিহ্যগতভাবে ফিনিশীয় রাজা হিরামের সমাধি বলে মনে করা হয়। এর বিশাল চুনাপাথরের কফিন বা সারকোফ্যাগাস প্রাচীন ফিনিশীয়দের সমাহিত করার ঐতিহ্য এবং প্রাচীন রাজ্যের স্থায়ী কীর্তিকে বহন করছে।










